প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর একের পর এক বিশাল ধাক্কা আসছে। এত কিছুর পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দমনপ্রাপ্ত হননি; বরং তিনি এখনো নিজ অবস্থানে দৃঢ় রয়েছেন। দলের ৮০ জন বিধায়কের বড় একটি অংশ বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি আলাদা উপদল গঠন করেছেন। পাশাপাশি, কিছু লোকসভা সাংসদরাও (এমপি) একটি আলাদা তৃতীয় জোট গঠন করেছেন। ফলে ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস কে?’— এই প্রশ্ন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থায় মমতা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি সাফ বলে দিয়েছেন, তাকে থামাতে হলে ‘‘খুন’’ করতে হবে।
দলীয় বিদ্রোহীদের স্পষ্ট ভাষায় ‘‘বিশ্বাসঘাতক’’ আখ্যা দিয়েছেন মমতা। তবে তিনি নিজের চিরচেনা মেজাজে ঘোষণা করেছেন, তৃণমূলের দলীয় প্রতীক অনুগত শিবিরের কাছেই থাকবে। মমতার এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিদ্রোহীরা যদি ঘাসফুল প্রতীক নিজেদের দাবি করতে চান তবে সামনে তাদের একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
মমতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘দলের প্রতীক কোথাও যাচ্ছে না। আমাকে যদি থামাতে চান, তবে আমাকে মেরে ফেলতে হবে।’
এদিকে শনিবার, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পদত্যাগ করেছেন। চন্দ্রিমা ছিলেন মমতার অনুগত একাধিক প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে অন্যতম। পদত্যাগের পর এই বিধায়কও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন উপদলে যোগ দিয়েছেন। ঋতব্রতের সমর্থকেরাই গত শুক্রবার কলকাতার তৃণমূল দলীয় কার্যালয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য আজ পদত্যাগ করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি এবং তিনি যে পদত্যাগ করবেন— তা তিনি আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন। কারণ, তার ছেলে আগে তৃণমূল-বিরোধী শিবিরের সাথে হাত মেলেছে।’
বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে উপদেষ্টার পদের প্রস্তাব দেওয়া হলেও, প্রায় পনেরো বছর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মমতা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন, কখনোই বিদ্রোহীদের সাথে হাত মেলাবেন না।
মমতা বলেন, ‘সেটা (প্রস্তাব দেওয়া) তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তিনি তা করতেই পারেন। কিন্তু আমি কোনোভাবেই তাদের সাথে যোগ দেব না।’
তিনি দাবি করেন, বিদ্রোহীরা চাপের মুখে পড়েই দল ছেড়ে চলে গেছে। মমতা আরও বলেন, ‘তবে আমি বিজেপির কাছে মাথা নত করব না, আর আমার দলও কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।’
তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় বিদ্রোহীদের দখলে নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও বক্তব্য রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘যারা গতকাল তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ে গিয়ে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমি একটা কথাই বলব— আমরা ওই অফিসটি ভাড়া নিয়েছিলাম। ২০২৭ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত অফিসটি আমাদের নামে লিজ নেওয়া আছে। কোনো ব্যক্তি দল ছেড়ে চলে যেতেই পারেন, তবে তা দলের প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটায় না। এটি দলের সম্পত্তি। আমি চাইলে তা নিজের দখলে নিতে পারি না। ‘মা, মাটি, মানুষ’-এর সম্পত্তি কেউ এভাবে জোর করে কেড়ে নিতে পারবে না।’
সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী ২০১১ সালে সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টকে উচ্ছেদ করেছিলেন। যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করে এবং বিজেপি সে সুযোগ কাজে লাগায়। মমতা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তার দলের আদর্শ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের (বিজেপি) সম্পূর্ণ বিপরীত।
মমতা বলেন, ‘এই প্রতীক আমার দেওয়া। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আপনাদের মনোনয়নপত্রে সই করেছিলাম আমি নিজেই। নির্বাচনের পর দুই মাস না যেতেই আপনারা কীভাবে বিশ্বাসঘাতক হয়ে গেলেন? সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত। আপনারা এখন বিজেপির সাথে হাত মিলিয়েছেন, যা এভাবে চলতে দেওয়া যায় না; কারণ, তৃণমূলের আদর্শই হলো বিজেপি-বিরোধী।’
তিনি আরও জানান, চন্দ্রিমার বিদায়ের পর তিনি নিজেই এখন জাতীয় ও রাজ্য— উভয় স্তরেই দলের মূল দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন। একই সাথে মমতা ঘোষণা করেন, এখন থেকে তাঁর নিজের বাড়ির দলীয় কার্যালয়ই তৃণমূলের প্রধান অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
তৃণমূলে দলত্যাগের ঘটনা ঘটে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে দল এবং মমতার নিজের পরাজয়ের পর থেকে। বিদ্রোহী বিধায়কেরা মমতার নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তারা এটাও জানান যে, দল ছাড়ার পেছনে মূল কারণ আসলে দলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষ।
এরই মধ্যে ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক (এমএলএ), ২০ জনেরও বেশি লোকসভা সাংসদ (এমপি) এবং অন্তত ৩ জন রাজ্যসভা সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল থেকে আলাদা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দলের রাজ্য সভানেত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার মাত্র কিছু সপ্তাহের মাথায় তার পদত্যাগের ঘোষণা করেছেন।
চন্দ্রিমা তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তার মনে সর্বদা সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা থাকবে। তবে নিজের এই সিদ্ধান্তের পেছনে পারস্পরিক আস্থার অভাবকেই দায়ী করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘যেখানে কোনো বিশ্বাস নেই, কোনো আস্থা নেই, সেখানে কাজ করা সম্ভব নয়। ঠিক এই কারণে আমরা পদত্যাগ করেছি।’
এদিকে, নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরকে আগামী ৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে তাদের নিজ নিজ দাবি ও পাল্টা দাবি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন