প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
মানুষের সভ্যতার সূচনা হয়েছিল মাটির সঙ্গে এবং সেই সভ্যতার টিকে থাকার ভিত্তি আজও খাদ্য। খাওয়ার উৎপাদন, শ্রম এবং হালাল উপার্জনকে ইসলাম কখনো কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখেনি; বরং এগুলোকে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
যে হাত মাটি চাষ করে, যে হাত বীজ বপন করে, যে হাত ঘাম ঝরিয়ে মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে, সেই হাতও আল্লাহর কাছে সম্মানিত, যদি তার উদ্দেশ্য হয় হালাল জীবিকা অর্জন এবং মানুষের উপকার করা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় মানুষের মর্যাদা তার পেশা দিয়ে বিচার করা হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে মর্যাদার ভিত্তি হলো তাকওয়া, সততা, আমানতদারি এবং সৎকর্ম; পেশার উচ্চতা-নিম্নতা নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনই এ শিক্ষার সর্বোত্তম উদাহরণ। নবুওয়াত লাভের আগে তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী কর্মজীবী মানুষ। তিনি হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)-এর বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব নিয়ে সততা, দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর অসাধারণ চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা এবং আমানতদারির কারণে মক্কার মানুষ তাঁকে আল-আমিন অর্থাৎ বিশ্বস্ত ব্যক্তি, উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
এ ঘটনা আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষও নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য শ্রমকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি কখনো অলসতা, পরনির্ভরতা বা অন্যের ওপর বোঝা হয়ে থাকার শিক্ষা দেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন, হালাল উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করা একজন মুমিনের মর্যাদার অংশ।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও আমরা একই আদর্শের প্রতিফলন দেখি। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরও জীবিকা নির্বাহের জন্য বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।
হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) ছিলেন আরবের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু তাঁর সম্পদ ছিল না বিলাসিতার জন্য; বরং ইসলাম, মানবসেবা এবং সমাজকল্যাণে তিনি অকাতরে তা ব্যয় করেছেন। তাবুক অভিযানে তাঁর অবদান কিংবা মদিনাবাসীর জন্য কূপ ক্রয় করে ওয়াকফ করে দেওয়া ইতিহাসে তাঁর উদারতার উজ্জ্বল নিদর্শন।
অন্যদিকে, বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের শাসক হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও নিজের শৈশবের শ্রমজীবী জীবনের কথা কখনো ভুলে যাননি। তিনি স্মরণ করতেন, একসময় এই প্রান্তরেই উট চরাতেন, ছেঁড়া কাপড় পরে কঠোর পরিশ্রম করতেন। সেই স্মৃতি তাঁকে অহংকার নয়, বিনয় এবং দায়িত্ববোধ শিখিয়েছিল।
হযরত আলী (রা.)-এর জীবনের একটি ঘটনা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। মদিনায় একদিন ঘরে খাদ্য ছিল না। ক্ষুধার্ত পরিবারের জন্য আহারের ব্যবস্থা করতে তিনি কাজের সন্ধানে বের হন। একজন নারীর জন্য কূপ থেকে পানি তুলে দেন। প্রতিটি বালতির বিনিময়ে একটি করে খেজুর পান। ষোল বালতি পানি তোলার পর তাঁর হাতে ফোসকা পড়ে যায়। সেই ষোলটি খেজুর নিয়েই তিনি ফিরে আসেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে। নবীজি (সা.) ঘটনাটি শুনে আবেগাপ্লুত হন এবং পরিবারের সবাই মিলে সেই খেজুর ভাগ করে আহার করেন।
এই ঘটনাগুলো শুধুমাত্র ইতিহাসের স্মৃতি নয়; এগুলো ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এখানে শ্রম লজ্জার নয়, সম্মানের। উৎপাদন গৌরবের, পরনির্ভরতা নয়। আত্মসম্মান আসে নিজের ঘামের উপার্জনে।
এই শিক্ষা কৃষির সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ কৃষি এমন একটি পেশা, যেখানে শ্রম, ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয় ঘটে। একজন কৃষক যখন বীজ বপন করেন, তখন তিনি জানেন না শেষ পর্যন্ত ফলন কেমন হবে। তবুও তিনি নিরলস পরিশ্রম করেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের দায়িত্ব চেষ্টা করা, আর ফল দেওয়ার মালিক আল্লাহ।
এ কারণেই ইসলাম কৃষিকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখেনি; বরং একে মানবকল্যাণের অন্যতম মহান মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে বা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকাস্বরূপ গণ্য হয়। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
একটি হাদিসই কৃষির মর্যাদা বোঝাতে যথেষ্ট। একটি গাছ, একটি ফসল কিংবা একটি ফল যদি কারও উপকারে আসে, তবে সেই উপকারের সওয়াব উৎপাদনকারীর আমলনামায় লিখতে থাকে। পৃথিবীর খুব কম পেশাই এমন ধারাবাহিক সওয়াবের সুযোগ এনে দেয়।
আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কৃষির বিকল্প নেই। বিশেষ করে কওমী মাদরাসা, মসজিদ, ওয়াকফ সম্পদ এবং স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ফলের বাগান, মৎস্যচাষ, গবাদিপশু পালন, মৌচাষ কিংবা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই সৃষ্টি করবে না; বরং নববী আদর্শের একটি বাস্তব ও কার্যকর প্রয়োগও হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামে ইবাদত শুধু মসজিদের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। হালাল উপার্জনের জন্য মাঠে ঘাম ঝরানো, জমিতে বীজ বোনা, মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করা, সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করা এসবও ইবাদতেরই অংশ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়।
আজ যখন আমাদের অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের সংকটে হতাশ, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের শ্রমময় জীবন আমাদের নতুন করে সাহস জোগায়। তাঁরা শেখান, কোনো কাজ ছোট নয়, ছোট হতে পারে মানুষের মানসিকতা। হালাল উপার্জন কখনো তুচ্ছ নয়, আর নিজের শ্রমে অর্জিত রুটি-রুজিই একজন মুমিনের প্রকৃত সম্মান।
যে জাতি শ্রমকে সম্মান করে, কৃষিকে মর্যাদা দেয় এবং উৎপাদনকে ইবাদত মনে করে, সেই জাতি দীর্ঘদিন দারিদ্র্য, বেকারত্ব কিংবা পরনির্ভরতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে না। ইসলামের ইতিহাস তার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও সেই পথেই আরও সমৃদ্ধ, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও কল্যাণময় হতে পারে ইনশাআল্লাহ।
লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা, পরিচালক, কতকিছুর হাট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন