প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তবুও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি হিজড়া ও মান্তা সম্প্রদায়ের। প্রশিক্ষণ পাওয়ার পরেও সামাজিক বৈষম্য, মূলধনের অভাব এবং নানামুখী অনীহার কারণে এই প্রান্তিক জনগণের প্রায় ৯৫ শতাংশ সদস্য মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারছেন না।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে বর্তমানে এই পিছিয়ে পড়া জনগণের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এর মধ্যে, যাদের জীবন ধারার অঙ্গ হিসেবে ঢোলের তাল এবং তালি দিয়ে আনন্দ বিলানো সেই হিজড়া জনগোষ্ঠী যেমন রয়েছে, তেমনি আছেন জাল-নৌকা নিয়ে জীবিকা নির্বাহকারী যাযাবর মান্তা সম্প্রদায়ও।
জেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে মোট ১ হাজার ৩০ জন হিজড়া মানুষ রয়েছেন। এর মধ্যে বরিশালে ৩৫০, পটুয়াখালীতে ২০০, ভোলায় ১৮০, বরগুনায় ১২০, পিরোজপুরে ১০০ এবং ঝালকাঠিতে ৮০ জন বসবাস করছেন।
প্রশিক্ষণ পাওয়ার পরও কেন তারা মূলধারায় ফিরে আসতে পারছেন না, তা তুলে ধরেছেন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য নুপুর। তিনি জানান, 'সরকার আমাদের সেলাই ও বিউটি পার্লারের কাজ শিখিয়েছে। আমি ভাবছিলাম এবার হয়তো মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পাতার অভ্যাস কমে যাবে। কিন্তু দোকানে যেতে হলে কেউ ঘর ভাড়া দিতে চায় না। মানুষ আমাদের দিকে তাকায় এমনভাবে, যেন আমরা এই সমাজেরই নই। বাধ্য হয়ে আবার পুরোনো পেশায় ফিরে যেতে হয়েছে।'
একইভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন তৃতীয় লিঙ্গের আরেক সদস্য সোহাগী। তিনি বলেন, 'আমাদের যোগ্যতা থাকলেও সমাজ তা মানতে পারেনি। আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার পরিচয় জানার পর তারা আমাকে আর রেখেনি। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।'
বরিশাল বিভাগের মান্তা সম্প্রদায়ের সংকটও একীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। যাযাবর এই জলমানবদের জীবনমান উন্নয়ন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি সংস্থাগুলি কাজ করেছে, যদিও বাস্তবে তাদের জীবন এখনও নৌকা ও জালেই সীমাবদ্ধ।
একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে মান্তা জনগণের মোট ২ হাজার ৯৪৮টি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোলায় ১ হাজার ৫৭০, পটুয়াখালীতে ৮৩০, বরিশালে ৩২০ এবং বরগুনায় ২২৮টি পরিবার বসবাস করে।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ভাঙার পাড়ে বসবাসকারী মান্তা সম্প্রদায়ের সদস্য ইকবাল মিয়া বলেন, 'আমরা তো জন্ম থেকেই জলেই ভাসছি। এনজিও থেকে আমাদের অন্য কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই কাজ করতে কোথায় যাব? আমাদের ডাঙায় কিছু জমি বা ঘর নেই। দিনশেষে সেই জাল এবং নৌকাই আমাদের শেষ ভরসা।'
অপর সদস্য জরিনা বেগম বলেন, 'আমি চেয়েছিলাম পোলাপানদের একটু লেখা পড়া শিখিয়ে ভালো পথে তৈরি করতে। কিন্তু পেটের তাগিদে বাধ্য হয়ে তাদের নিয়ে নদীতে নামতে হয়।'
এই পিছিয়ে পড়া জনগণের সমস্যা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলি তাদের সীমাবদ্ধতার কথা জানান। তবে সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তারা ভিন্ন কথা বলেছেন। তাদের মতে, শুধু সুযোগের অভাবই নয়; সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই জনগণের নিজেদের অনীহা একটি বড় কারণ।
এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা 'আভাস'-এর মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর মো. আলী আহসান বলেন, 'আমরা মাঠ পর্যায়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছি এবং বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের একার পক্ষে এত বড় জনগণের পুনর্বাসন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এখানে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান।'
বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ কে এম আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, 'সরকার এই প্রান্তিক জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের জন্য ভাতা, আবাসন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও মূলধারার কাজে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা অনীহা কাজ করে। তবে আমরা হতাশ নই। এই পিছিয়ে পড়া জনগণকে পুরোপুরি মূল অর্থনীতিতে যুক্ত করতে সরকার কিছু নতুন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।'
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন