প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈয়ের 'আত্মহত্যার' জন্য তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে তার প্রেমিক ইয়াছিনের ধারাবাহিক 'মানসিক নিপীড়ন'কে দায়ী করা হয়েছে। এর মধ্যে ইয়াছিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি তার পক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন।
গত বছর ২৯ এপ্রিল, সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের বাসায় দাবি অনুযায়ী আত্মহত্যা করেন অথৈ। তার বাবার দ্বারা ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে পরদিন সূত্রাপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ইয়াছিন সেই সময় লালবাগ এলাকায় 'জমিদারি ভোজ' রেস্তোরাঁয় ওয়েটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেইদিনই গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইয়াছিনকে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক মাস কারাভোগের পর জামিন পেয়ে ইয়াছিন গত ২৬ এপ্রিল জামিন বাতিল হয়ে আদালতে হাজির থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, তদন্তের শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছি। কী কারণে আত্মহত্যা করেছে, ভিকটিমের মনের কথা আমার জানা সম্ভব নয়। তবে প্রেমিককে আসামি করা হয়েছে এবং অভিযোগপত্রে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অথৈ এবং ইয়াছিনের বাড়ি পাশাপাশি এবং তারা চট্টগ্রামের একটি স্কুলে একসাথে পড়াশোনা করেছেন। ইয়াছিন বিভিন্ন সময়ে অথৈকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও সে থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর অথৈ ২০২২-২০২৩ সেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হয়। সে সূত্রাপুর এলাকায় একটি মেসে বাস করছিল।
অথৈ ঢাকায় স্থানান্তর হলে ইয়াছিনও একই পথে চলে আসে এবং লালবাগ এলাকায় 'জমিদারি ভোজ' রেস্তোরাঁয় চাকরি নেয়। এরপর ইয়াছিন আবারও অথৈকে 'উত্ত্যক্ত' করতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে একটি 'প্রেমের সম্পর্ক' গড়ে ওঠে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তাদের মোবাইল ফোনসহ সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ হত। তবে সম্পর্কের পর ইয়াছিন 'অপমানজনক কথাবার্তা ও অপবাদ' দিয়ে অথৈকে মানসিক নিপীড়ন করত। ঘটনার দিন ২৯ এপ্রিল অথৈ তার ক্যাম্পাসে সংগীত উৎসবের অনুশীলন শেষে মেসে ফিরছিল।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াছিন সংগীত উৎসবে অংশগ্রহণ করতে অথৈকে বারণ করেন। এইসময় তরুণটি গালমন্দসহ অপমানজনক কথাবার্তা বলে। তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়াছিনের আচরণ সহ্য করতে না পেরে অথৈ বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যবর্তী সময়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ইয়াছিন ঘটনার সময় ও আগে মোবাইলে কথাবার্তা থেকে ধারণা করেছিল, অথৈ আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। সে মেস বাড়ির মালিক ও আশপাশের লোকদের নিয়ে অথৈয়ের রুমের দরজার লক ভেঙে প্রবেশ করে অথৈকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। তাকে দ্রুত নিচে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে।
অথৈয়ের বাবা প্রণব মজুমদার চট্টগ্রামে বসবাস করেন। যোগাযোগ করার পর প্রণব মজুমদার বলেন, মেয়েটা মারা যাওয়ার পর আমি ভেঙে পড়েছি। অসুস্থ হয়ে পড়েছি। সন্তান হারানোর বেদনা বাবা ছাড়া কেউ বুঝে না। সেই বেদনা কীভাবে কাটবে, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানেন না।
প্রণব মজুমদারের দুই মেয়ের মধ্যে অথৈ ছিল ছোট। বড় মেয়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। অথৈকে নিয়ে তার বাবা নানা পরিকল্পনা করেছিলেন, দেশে পড়াশোনা শেষে তাকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। প্রণব মজুমদার বলেন, মেয়েটাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর নিশ্চিতভাবেই তাকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর প্ল্যান ছিল। কিন্তু তা আর হলো না। মেয়েটাকে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য করা হলো। আমি যার জন্য মেয়েকে হারিয়েছি, তার শাস্তি চাই।
বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় অভিযোগ করেন, আসামির মানসিক টার্চারে ভিকটিম আত্মহত্যা করে। ভিকটিমের এবং আসামির মধ্যে ফিজিক্যাল রিলেশনের একটি ছবি ছিল, যার মাধ্যমে ভিকটিমকে ভয় দেখানো হত। মানসিক টর্চার করা হত এবং তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। সিআইডি পুলিশের ফরেনসিক রিপোর্টে ওই ছবি পাওয়া গেছে। বাদীপক্ষের দাবি অনুসারে আসামি প্রথম থেকে এমন কিছু নেই বলে দাবি করলেও ফরেনসিক রিপোর্টে ছবিটি পাওয়া যাওয়া পর তার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী বলেন, ভিকটিমের মা-বাবার চাওয়া ছিল—ঘটনার প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসুক। মেয়ের আত্মহত্যার কারণ কী। প্রমাণ হলো, আসামির মানসিক টর্চামে ভিকটিম আত্মহত্যা করেছে।
অন্তরঙ্গ ছবির বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, এমন কিছু তদন্তে পাইনি। আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ছেলেটা খুব ভালো। তবে সে মারাত্মক অসুস্থ ছিল। বেশ কয়েক দিন আগে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গিয়েছে—এটি ওর পরিবার জানিয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবীকে বিষয়টি জানিয়েছি। আগামী তারিখে আদালতকেও অবহিত করব।
ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে আসামির আইনজীবী বলেন, ছেলেটাকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি—এমন কিছু আছে কি না। তার কাছে কিছু নেই বলে জানিয়েছে। ওর ফিজিক্যাল ফিটনেস এমন ছিল না। সে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে ছিল। জামিন চেয়েছিলাম মেডিকেল গ্রাউন্ডে। শুনেছি তার শারীরিক অবস্থার কারণে আদালত জামিন দেয়। নগ্ন ছবি থাকার তথ্য সত্য নয়। বাদীপক্ষের আইনজীবীর তথ্য অকার্যকর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন