প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
চলতি বছরের গ্রীষ্মে নজিরবিহীন দাবদাহের কারণে ইউরোপজুড়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে গবেষকরা ধারণা করছেন। তাদের মতে, এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী। ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের ইতিহাসে দাবদাহজনিত প্রাণহানির দিক থেকে অন্যতম ভয়াবহ সময় হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণা সাময়িকী নেচার হেলথে প্রকাশিত দুটি গবেষণা নিবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের গ্রীষ্মে দাবদাহে মোট ৫০ হাজার ৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক ক্লেয়ার বার্নস, যিনি প্রতিবেদনটির অন্যতম লেখক, বলেন, দাবদাহজনিত মৃত্যুর হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল।
জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নেতাদের তুরস্কে সমবেত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয় যে, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
ক্লেয়ার বার্নস আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ঠেকানোর পথ থেকে বিশ্ব অনেকটাই সরে গেছে। তিনি সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের এবং সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বিশ্বের দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ ইউরোপে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের মধ্যে দাবদাহ এখন অন্যতম প্রাণঘাতী বিপদ হয়ে উঠেছে। মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত পুরো মহাদেশ নজিরবিহীন তাপমাত্রায় পুড়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, পশ্চিম ইউরোপে এ বছর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গরম রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কিছু দেশে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়।
যেভাবে মৃত্যুর হিসাব নির্ধারণ
চলতি গ্রীষ্মে দাবদাহে প্রাণহানির হিসাব নির্ধারণ করতে ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা। এরপর জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে তাপমাত্রা কেমন থাকত, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনা করা হয়।
জুনের শুরু থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত দাবদাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যা নিরূপণে উচ্চ তাপমাত্রা ও দৈনিক মৃত্যুর সম্পর্ক নিয়ে আগের পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় ব্যবহৃত একটি মডেল প্রয়োগ করা হয়। গবেষকরা জানান, এই পদ্ধতিতে পাওয়া আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা বিভিন্ন দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের কাছাকাছি থাকে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ৫০ হাজার ৩৯১ জনের এই প্রাণহানি গত ২৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২২ ও ২০০৩ সালে ইউরোপে যে ভয়াবহ দাবদাহ হয়েছিল, এবারের প্রাণহানির সংখ্যা তার চেয়ে বেশি।
দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপে দাবদাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়লেও যুক্তরাজ্যসহ উত্তর ইউরোপের তুলনামূলক শীতল দেশগুলোতেও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।
বয়সভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে। তবে ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সি অন্তত ৮০০ জনের মৃত্যুর সঙ্গেও দাবদাহের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
দাবদাহে বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দাবদাহজনিত মৃত্যুর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে দাবদাহে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট উষ্ণতা দায়ী ছিল। বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস বলেন, দাবদাহ কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, গবেষণার ফল তার প্রমাণ তুলে ধরেছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হওয়ায় দাবদাহকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
তিনি আরও বলেন, কম বয়সি মানুষের মৃত্যুও উদ্বেগের বিষয়। ৬৫ বছরের কম বয়সি হাজার হাজার মানুষ এ গ্রীষ্মে দাবদাহের কারণে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্লেয়ার বার্নস সতর্ক করে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বিশ্বকে একের পর এক তীব্র ও বিপজ্জনক গ্রীষ্মের মুখোমুখি হতে হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে দাবদাহ আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: সিএনএন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন