প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানের একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছিল। তিনি বিশ্বের পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান এএমডিতে চিপ নকশাবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। তবে, দেশের তরুণ প্রকৌশলীদের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে কাজ করার স্বপ্নে তিনি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
সেই স্বপ্নের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে তিনি ঢাকায় চারজন প্রকৌশলী নিয়ে ইউএলকাসেমির যাত্রা শুরু করেন। আজ প্রায় দুই দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি ৬০০-এর বেশি নকশা প্রকৌশলীর একটি আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর নকশা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা টিএসএমসির নকশা কেন্দ্র জোটেরও অংশ।
এনায়েতুর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এক পর্বে সিলিকন ভ্যালিতে গিয়ে এএমডিতে সেমিকন্ডাক্টর চিপ নকশাবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে কাজের সময় তিনি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দ্রুত পরিবর্তন ও এশিয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীর ধারণা পান। তখন প্রশ্ন জাগে, যদি দেশের তরুণ প্রকৌশলীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তারাও আন্তর্জাতিক চিপ নকশা শিল্পে নিজেদের প্রতিস্থাপন করতে পারবেন কিনা। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগণ ও প্রতিবছর অনেক প্রকৌশলী তৈরির বিষয়টি তাঁকে আশাবাদী করে তোলে।
পরিশেষে প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে দেশে retorn 오는 সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০০৭ সালে ঢাকায় চারজন প্রকৌশলী নিয়ে শুরু হয় ইউএলকাসেমির যাত্রা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করা হয়।
শুরুর পথ কিন্তু সহজ ছিল না। বাংলাদেশে তখন চিপ নকশা শিল্পের শক্তিশালী পরিবেশ ছিল না। দক্ষ প্রকৌশলী প্রস্তুত করা, আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আস্থা অর্জন, এবং নতুন প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কাও সামলাতে হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে।
শুরুতে ইউএলকাসেমি চিপের বিন্যাস নকশার কাজ দিয়ে এগিয়েছে। পরে ধীরে ধীরে চিপের কাঠামো নির্ধারণ, নকশা যাচাই ও ভৌত নকশাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত কাজে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করে। বর্তমানে, ইউএলকাসেমিতে ৬০০-এর অধিক নকশা প্রকৌশলী কাজ করছেন এবং চারটি দেশে প্রতিষ্ঠানটির নকশা কেন্দ্র রয়েছে। সংস্থার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যদের সম্মিলিত সিলিকন ভ্যালির অভিজ্ঞতা ২৫০ বছরেরও বেশি।
প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। অ্যানালগ সার্কিট নকশা, বিশেষায়িত চিপ বিন্যাস, চিপের ভৌত নকশা, চিপের কাঠামো ও নকশা যাচাইসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দিচ্ছে।
ইউএলকাসেমির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৪০০-এর বেশি ভৌত নকশা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তাদের ১৫০টি এসআরএএম এবং ৫০টি ওটিপি নকশা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় মাইলফলক ২০২১ সালে আসে। সেবছর ইউএলকাসেমি টিএসএমসির নকশা কেন্দ্র জোটের অংশীদার হয়। এই জোট চিপ বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের নকশা সমাধানের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ग्राहकদের নকশা সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, দেশের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বৈশ্বিক চিপ নকশা শিল্পের কার্যক্রম করতে সক্ষমতা দেখিয়েছে।
তবে এনায়েতুর রহমানের লক্ষ্য কেবল নিজের প্রতিষ্ঠানকে বড় করা নয়। তিনি বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখছেন। তাঁর মতে, বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনের চেয়ে, চিপ নকশা, নকশা যাচাই, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের মতো ক্ষেত্রে দক্ষতা তৈরি করাই বাংলাদেশের জন্য অধিক বাস্তবসম্মত।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার প্রকৌশলী স্নাতক হন। তাদের যদি বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক চিপ নকশা ও প্রকৌশল সেবা খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এনায়েতুর রহমান।
সেমিকন্ডাক্টর খাতকে সম্ভাবনাময় উচ্চপ্রযুক্তির রপ্তানি শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। দক্ষ লোকবল তৈরি, নীতিগত সমর্থন এবং প্রযুক্তি খাতের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে এই শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে ইউআরকাসেমি। চিপের অ্যানালগ ও ডিজিটাল নকশা যাচাই এবং বিন্যাস প্রকৌশলের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা তৈরির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একসময় এনায়েতুর রহমান এএমডির মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে চিপ নকশা করতেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের দেশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখানে এখন শত শত বাংলাদেশি প্রকৌশলী বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য কাজ করছেন। চারজন প্রকৌশলী নিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ ৬০০-এর বেশি প্রকৌশলীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে বসেও উচ্চপ্রযুক্তির বৈশ্বিক শিল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কাজ করা সম্ভব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন