প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দারিদ্র্য, অভাব আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে জীবনের পথচলা শুরু করেছিলেন হোসেন আলী। তবে তিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে সেই সংগ্রামকে সাফল্যে পরিণত করেছেন। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা হোসেন আলী (৩৫) শুধুই নিজেকে আত্মনির্ভর করেছেন না, কৃষকদের জন্যও তৈরি করেছেন সময়োপযোগী বেশ কয়েকটি কৃষি যন্ত্র।
পাংশা উপজেলার মৌরাট ইউনিয়নের স্বর্ণলতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হোসেন আলী, যিনি অত্যন্ত অসচ্ছল একটি পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাবা আমীর আলী এবং মা রাবেয়া বেগমের ৮ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ফলে তিনি পড়ালেখা বন্ধ করে জীবিকার সন্ধানে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। পাংশা শহরের একটি ওয়ার্কশপে কুষ্টিয়ার অভিজ্ঞ মিস্ত্রি জামাত আলীর কাছে কাজ করার সুযোগ পান হোসেন আলী। প্রাথমিকভাবে তাকে মজুরি হিসেবে শুধুমাত্র খাবারের ব্যবস্থা দেওয়া হচ্ছিল।
ওয়ার্কশপে কাজ করার সময় তিনি কৃষি যন্ত্রের গঠন, ব্যবহার এবং মেরামতের কৌশল রপ্ত করতে সক্ষম হন। একসময় তাঁর ওস্তাদ জামাত আলী হৃদরোগে মারা গেলে, ওয়ার্কশপের দায়িত্ব হোসেন আলীর কাঁধে অর্পিত হয়। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
পরে পাংশা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় তিনি গাজীপুরের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‘সিমিট বাংলাদেশ’ থেকেও আধুনিক কৃষি যন্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এসব প্রশিক্ষণ তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
পাংশা অঞ্চলে প্রতিবছরই প্রচুর পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। কিন্তু সংরক্ষণে সমস্যা থাকায় কৃষকদের কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। এ সমস্যার সমাধানে হোসেন আলী তৈরি করেন স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের উপযোগী এয়ার ফ্লো পেঁয়াজ সংরক্ষণ মেশিন, যা একসঙ্গে ২০০ থেকে ৩০০ মণ পেঁয়াজ দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করতে সক্ষম। এরপর তিনি উদ্ভাবন করেন পেঁয়াজ গ্রেডিং মেশিন, যা ছোট-বড় পেঁয়াজ আলাদা করতে সক্ষম।
এই বিষয়ে পাংশা বাগদুলি গ্রামের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সোহান আলী বাসস’কে জানান, ‘‘আমি পেঁয়াজের ব্যবসা করি। অল্প সময়ে পেঁয়াজ বেছে বাজারে বিক্রি করা এখন আমার জন্য খুব সহজ হয়েছে। হোসেন আলীর তৈরি পেঁয়াজ গ্রেডিং মেশিন কিনে আমি খুব উপকৃত হয়েছি।’’ পাশাপাশি তিনি ঘাস কাটার মেশিন এবং সর্বশেষ কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়ানোর মেশিন তৈরি করে কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
হোসেন আলী বাসস’কে বলেন, ‘‘তার উদ্ভাবিত পাটের আঁশ ছাড়ানোর মেশিন এক ঘণ্টায় প্রায় ১০০ আঁটি কাঁচা পাটের আঁশ ছাড়াতে সক্ষম। এতে শ্রমিকের প্রয়োজন অনেক কমে যায়। মেশিনে আঁশ দ্রুত ছাড়িয়ে শুধু পানিতে ভিজিয়ে রাখলেই কয়েক দিনের মধ্যে পাওয়া যায় উজ্জ্বল সোনালি আঁশ।’’
চাঁদপুর থেকে আসা কৃষক কাউসার আহমেদ বাসস’কে বলেন, ‘‘আমি বাণিজ্যিকভাবে পাট চাষ করি। এত পাটের আঁশ শ্রমিক দিয়ে ছাড়াতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। বর্তমানে অধিক মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই হোসেন আলীর তৈরি মেশিনটি কাজ সহজ করবে বলে কিনেছি।’’
বর্তমানে হোসেন আলীর ওয়ার্কশপে পাঁচজন কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। মাসে তার মেশিন বিক্রি ও কর্মচারীর বেতন দিয়ে আয় হয় ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা। এতে তিনি খুব খুশি। বিভিন্ন জেলার কৃষকরাও তার তৈরি যন্ত্র কিনতে আসছেন। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও তার উদ্ভাবিত কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বাড়ছে।
জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেসে যান হোসেন আলী। চোখে জল আসলে তিনি বলেন, ‘‘এক সময় পেটের ভাতের জন্য কাজ করেছি। আজ আমার তৈরি মেশিন কৃষকের কাজে লাগছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সামনে আরও আধুনিক কৃষিযন্ত্র তৈরি করে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে চাই।’’
হোসেন আলীর জীবনগাথা প্রমাণ করে যে, দারিদ্র্য কখনো সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। অধ্যবসায়, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয় ঘটালে একজন সাধারণ মানুষও সমাজে পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। তার সাফল্য শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে।
এ বিষয়ে পাংশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেন বাসস’কে বলেন, ‘‘হোসেন আলীর মধ্যে প্রযুক্তির উদ্ভাবনী গুণ রয়েছে দেখে আমরা উনাকে গাজীপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। তার কর্মদক্ষতা ও একাগ্রতা দেখে আমরা সব সময় তার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে এলাকায় সুনাম অর্জন করেছে হোসেন আলী। সম্প্রতি পাংশায় অনুষ্ঠিত কৃষি মেলায় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন তার উদ্ভাবনী প্রযুক্তি দেখে তাকে অনেক সাহস জুগিয়েছেন। কোন সমস্যা দেখা দিলে জেলা প্রশাসককে জানানোর জন্য বলেছেন।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন