প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন মন্তব্য করেছেন যে, দুর্নীতি দমনে শুধু তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। এর জন্য কার্যকর প্রতিরোধ সৃষ্টি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য।
তিনি উল্লেখ করেছেন, দুর্নীতি হলো উন্নয়ন চলার পথে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা, যা জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে, বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটায়।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, কোনো দেশের জন্য রাতারাতি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ দুর্নীতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আজ সচিবালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে সরকার একটি টেকসই উন্নয়নভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছে।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলনা করে তিনি আরও বলেন, দুই দেশই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
এ সময় তিনি বলেন, যে কোনো রাজনৈতিক রূপান্তরের পর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই জন্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ফারজানা শারমীন বলেছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই সংঘাত বা সহিংসতার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত নয়, বরং সংবিধানসম্মত ও গণতান্ত্রিক উপায়ে তা হতে হবে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের অধিকার রক্ষা করা, বিশেষ করে তরুণদের ন্যায়সংগত প্রত্যাশা পূরণ করা এবং জনসেবাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সরকারের সঙ্গে জনগণের নিবিড় সংযোগ এবং কার্যকর সেবা নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারিত করছে।
এর মধ্যে একটি উদ্যোগ হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, যা কেবল আর্থিক সহায়তার জন্য নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে বিবেচিত হচ্ছে।
ফারজানা শারমীন আরও জানান, পরিবারই একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তাই পরিবারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রান্তিক পরিবারের নারী প্রধানদের প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই সহায়তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিতরণ করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পায়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর্মসূচির পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ৬৭ হাজারের বেশি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আগামীতে পর্যায়ক্রমে দেশের নিম্ন আয়ের প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
ফারজানা শারমীন বলেছেন, এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা।
তিনি উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে এবং উৎপাদনশীল মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
তার মতে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়কে সরকারের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দশকে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এসবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সরকার এক দিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফারজানা শারমীন বলেছেন, শুধু ভাতা বা সহায়তা দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান।
সরকার পরিচালনায় নতুন নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন মন্তব্য করেছেন যে, ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য নতুন চিন্তা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকাই অভিজ্ঞতার একমাত্র মানদণ্ড নয়। দক্ষতা, পেশাদারিত্ব, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই একটি কার্যকর সরকার পরিচালনা সম্ভব।
বর্তমান সরকার তথ্য-উপাত্তভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে ফারজানা শারমীন জানান।
আঞ্চলিক সহযোগিতা বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও যৌথ সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
একই সঙ্গে বিমসটেকের মাধ্যমে বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ সম্প্রসারণে কাজ করতে আগ্রহী।
ফারজানা শারমীন বলেছেন, প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অধিক কল্যাণকর এবং এ অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, শ্রীলঙ্কা সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে সামাজিক সুরক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি এবং বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উভয় দেশই অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ফারজানা শারমীন মন্তব্য করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বহু নারী রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় রেখেছেন। বাংলাদেশেও নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দীর্ঘ ঐতিহ্য বিদ্যমান। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ওষুধশিল্প, কৃষি, পর্যটন, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং সামাজিক কল্যাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
ফারজানা শারমীন আশা প্রকাশ করেছেন যে, নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধি পেলে, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন