প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
তাজমহল, যা ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য এবং ভারতের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ, আসলে কী—এটি কি মোগল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত স্মৃতিসৌধ, নাকি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ‘তেজো মহালয়া’? এই আইনি বিতর্ক নতুন করে আবার সামনে আনা হয়েছে।
সম্প্রতি, আগ্রা আদালতের খারিজ হওয়া দুটি আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি রিভিশন পিটিশনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) মতামত জানতে চাইতে নোটিশ জারি করেছে।
আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআই-এর কাছে জানতে চেয়েছেন, কেন এই সৌধের জরিপ করা যাবে না বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য।
ঐতিহাসিক দাবি অনুসারে, ১১৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব ‘তেজো মহালয়’ নামে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, যা বর্তমান তাজমহলের অবস্থানে ছিল। ওই মন্দিরে দেবতা আগ্রেশ্বর মহাদেব বিরাজ করছেন। সেই সূত্রে মামলায় এই হিন্দু দেবতাকে মূল পক্ষ করা হয়েছে এবং তার পক্ষ থেকে আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন ও অন্য ভক্তরা পিটিশনটি দাখিল করেছেন।
আবেদনকারীদের দাবি রয়েছে যে, সময়ের সাথে সাথে এই সম্পত্তি রাজা মানসিংহের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং ১৭ শতকে জয়পুরের রাজা জয়সিংহ এই স্থানে অভিষিক্ত হন। এরপর মোগল শাসক শাহজাহান রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে এই প্রাসাদটি জোরপূর্বক দখল করেন এবং এটি নিজের স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিসৌধে রূপান্তরিত করেন।
আরও দাবি করা হয় যে, এই রূপান্তরের জন্য ইসলামি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করতে সৌধের কিছু অংশ পরিবর্তন করা হয় এবং অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রমাণ করে এটি একটি হিন্দু মন্দির। তাই ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সৌধের ভেতরে ‘দর্শন’ ও ‘পূজা’ করার মৌলিক অধিকার হিন্দুদের রয়েছে বলে দাবি জানানো হয়েছে।
তবে বাদীপক্ষের এই দাবির বিপরীতে প্রচলিত ইতিহাস এবং সরকারি নথিতে ভিন্ন বিবরণ উঠে আসে। ইতিহাসবিদদের মতে, তাজমহল বানানোর কাজ শুরু হয় ১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ সালের দিকে।
বর্তমানে ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাজার মূল্যের এই স্মৃতিসৌধটি ভারতের মুখ্য পর্যটন কেন্দ্র। এমনকি ভারত সরকারের পর্যটন-বিষয়ক ওয়েবসাইট এবং ইউনেস্কোর নথিতে স্পষ্ট বলা রয়েছে যে, এটি মোগল সম্রাট শাহজাহান তার পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতেই তৈরি করেছিলেন।
এই সৌধ নিয়ে মূলত আইনি লড়াইয়ের উৎস ঘটেছিল ২০১৫ ও ২০১৯ সালে, যখন তাজমহল জরিপের উদ্দেশ্যে এবং এর ভেতরের স্থিরচিত্র ও ভিডিওগ্রাফির জন্য ‘অ্যাডভোকেট-কমিশনার’ নিয়োগের আবেদন করা হয়। কিন্তু আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ এই আবেদনটিকে রক্ষণাবেক্ষণের অযোগ্য বলে খারিজ করে দেন।
আদালত যুক্তি প্রদর্শন করে যে, বাদীপক্ষ তাজমহলের সুনির্দিষ্ট জায়গা নিশ্চিত করার জন্য কোনো রাজস্ব নথি বা খতিয়ান দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের বর্ণিত সম্পত্তির সীমানা ও আয়তন সরকারি নথির সঙ্গে মেলেনি। নিম্ন আদালতের এই দুটি আদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাদীপক্ষ এবার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
বর্তমানে মামলার নতুন আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এএসআই বেআইনিভাবে গত শুক্রবার তাজমহলে মুসলিমদের নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছে, যার ফলে দর্শনার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভবনের বেশ几个 তলা তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
যেহেতু সৌধের ভেতরের শারীরিক ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য কেবল মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, তাই আবেদনকারীরা হাইকোর্টের কাছে দাবি জানিয়েছেন যেন আগ্রা আদালতের আগের আদেশ বাতিল করে ট্রায়াল কোর্টকে গুণাগুণের ভিত্তিতে অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সাথে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ হিসেবে এএসআই-এর পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হোক যাতে আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে ভবনের ভেতর ও বাইরের ছবি তুলে তা আদালতে দাখিল করা হয়।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, তিন দশক আগে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে ভারতে যেভাবে আইনি ও সামাজিক বিতর্কের সূচনা হয়েছিল, ঠিক তেমনই, ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রামমন্দির হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথে, তাজমহল নিয়ে শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়া ভারতে নতুন বিতর্কের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেছে।
এর আগে আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের ছেলে বিষ্ণুশঙ্কর জৈনও এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, যে সকল সৌধের নিচে হিন্দুদের কথিত পবিত্র স্থান রয়েছে, তেমন একটি দীর্ঘ তালিকা তারা প্রস্তুত করেছেন এবং হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এগুলো বেছে বেছে বের করে মামলা করা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন