প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
নাব্য সংকট, ভাঙা ঘাট, নিরাপদ জেটির অভাব ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা কারণে খুলনার নদীবন্দরগুলো কার্যক্ষমতা দিন দিন হারাচ্ছে। খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরে পণ্যবাহী জাহাজের আগমন কমে গেছে, যা পণ্য খালাসের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে যাওয়ার কারণ হয়েছে। এ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঘাটশ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর। বন্দর ব্যবহারকারীরা দ্রুত ড্রেজিং, ঘাট সংস্কার ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যের একটি প্রধান মাধ্যম নদীপথ। মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ভৈরব নদী হয়ে সার, কয়লা, পাথর, চাল এবং অন্যান্য পণ্য লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরে আনা হয়। এরপর সেখান থেকে এসব পণ্য খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু খুলনা নদীবন্দর এলাকায় বিভিন্ন ঘাটে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। কিছু স্থানে ঘাট ধসে পড়েছে, আর কিছু স্থানে জাহাজ ভেড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এর সাথে রয়েছে পর্যাপ্ত জেটির অভাব, ওপেন ইয়ার্ডের সংকট এবং নদীর নাব্য কমে যাওয়ার সমস্যা, যার কারণে বড় পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে ভিড়তে পারছে না। একই চিত্রটি নওয়াপাড়া নদীবন্দরের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানে একাধিক জাহাজ ঘাটের জন্য নদীতে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে। ভাটার সময় পানির উচ্চতা কমে গেলে অনেক জাহাজ নদীর তলদেশে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
খুলনা বিভাগীয় নৌ-পরিবহন মালিক সমিতির পরিচালক আসিফ আহমেদ বলেন, ‘শুধু অবকাঠামোগত সংকটই নয়, মোংলা বন্দরে আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবও পড়েছে খুলনা অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোতে। গত দুই বছরে জাহাজের আগমন এবং পণ্য খালাস প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগায় আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ঘাটশ্রমিকদের জীবনে। একসময় খুলনা ও নওয়াপাড়ায় দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে সংখ্যাটি ৫০০ এর নিচে নেমে এসেছে। যাদের কাজ রয়েছে, তাদেরও মাসের অর্ধেক সময় কর্মহীন অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে।’
খুলনা নদীবন্দরের শ্রমিক মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘ঘাটের অবস্থা খারাপ থাকায় এখানে আগের মতো জাহাজ আসে না। এই সমস্যা গত দুই বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। আগে প্রায় প্রতিদিনই জাহাজ আসতো। এখন সপ্তাহ পার হয়ে যায়, কাজ মেলে না। আমি পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
অন্য শ্রমিক মো. রুবেল শেখ মন্তব্য করেন, ‘আগে যে আয় হতো, এখন তার অর্ধেকও হয় না। অনেক সহকর্মী কাজ না পেয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আমরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’
খুলনা অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, ‘নদীপথে পণ্য পরিবহনের উপর রাজস্ব বেড়েছে। অন্যদিকে ঘাট এবং নদীর সক্ষমতা কমেছে। দ্রুত ড্রেজিং, নিরাপদ জেটি নির্মাণ, ঘাট সংস্কার এবং আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তবে খুলনা নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলছেন, ‘নদীর নাব্য উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বন্দরের আধুনিকায়নে বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাসের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে খুলনা নদীবন্দর থেকে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা এবং নওয়াপাড়া নদীবন্দর থেকে ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দ্রুত সমাধান না হলে নদীবন্দরগুলোর কার্যক্রম আরও সংকুচিত হবে, যা পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন