প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
উত্তরের পাঁচটি জেলায় তিস্তার ভাঙন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে, এবং জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলেও ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানিয়েছেন, গত সাত দিনে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তার ভাঙনে ৩৮৬টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তিনি আরও জানান, ভাঙন থেমে নেই, বরং এই পাঁচ জেলার ১১৩টি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। আমরা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছি।
তিস্তা নদীর ভাঙনের কারণে প্রতিদিনই বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এর ফলে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের সিংগীজানী ও ভোরের পাখি এলাকায় সম্প্রতি হঠাৎ ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কয়েকদিন ধরে তিস্তা নদীতে স্রোতের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। হঠাৎ স্রোতের তীব্রতা বেড়ে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। অল্পসময়ের মধ্যে নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়তে থাকে এবং একের পর এক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
ভাঙন এতটাই আকস্মিক ছিল যে, অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল, কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পায়নি। নদীপাড়ের বাসিন্দারা চোখের সামনে বসতভিটা ও ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। কেউ কয়েকবার বসতভিটা পরিবর্তন করেছেন, আবার কেউ নদীর পাড়ে নতুন করে ঘর তুলেছেন। কিন্তু এবার আকস্মিক ভাঙনে অনেকের সেই শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে চলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, "হঠাৎ করে নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়। ঘরের অনেক মালামাল বের করারও সুযোগ হয়নি।"
আহাদ মিয়া নামে আরেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য বলেন, "সারা জীবনের কষ্টে তৈরি করা ঘর চোখের সামনে নদীতে চলে গেছে। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে পরিবার নিয়ে চলব-কিছুই বুঝতে পারছি না।"
ভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়ি নয়, নদীর তীরবর্তী ফসলি জমি, গাছপালা ও অন্যান্য স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও পরিবার তাদের বসতভিটা হারাতে পারে।
এদিকে, ভাঙনের খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি। তিনি ভাঙন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, ভাঙন প্রবণ এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর ও রাজাহাট উপজেলায় একই অবস্থা বিরাজ করছে, গত সাত দিনে এই দুই উপজেলায় ৮০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী পাড়ের মানুষ চোখের সামনে তাদের স্বপ্নে গড়া ঘরবাড়ি বিলীন হতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছে। গবাদিপশু ও ছেলেমেয়ে নিয়ে তারা এখন কোথায় থাকবেন এই চিন্তায় দিশেহারা।
লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলাতেও তিস্তা ভাঙছে, এবং এই নদীর ভাঙন থামছে না। পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় বলেন, "আমরা কিছু জায়গায় ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলেছি, কিন্তু স্থায়ী ভাঙন রোধের জন্য বরাদ্দ না থাকায় কিছুই করা সম্ভব নয়।"
স্থানীয় খুলিয়াগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান বাদল বলেছেন, "আগ্রাসী তিস্তা কোনোভাবেই থামছে না, প্রতিদিনই ভাঙছে নদী।"
রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়া উপজেলায়ও একইভাবে ভাঙন চলছে। গত সাত দিনে এই তিন উপজেলার ৫৩টি বসতবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজ উদ্দিন। তিস্তাপাড়ের মানুষের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। তারা বলছেন, "আমরা চাই না কোন ত্রাণ চাই, আমরা চাই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ।"
সরেজমিনে দেখা যায়, নীলফামারীর ভাঙন কবলিত এলাকার শত শত পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। রান্না বা খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ কেউ উঁচু বাঁধ ও স্বজনের আঙিনায় অমানবিক দিন কাটাচ্ছেন; জরুরি ভিত্তিতে তাদের জন্য তাঁবু ও শুকনা খাবার প্রয়োজন।
চর খরিবাড়ির বাসিন্দা আব্দুল করিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "এখন কোথায় যায়া ঠাঁই নিমু! ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও কাড়ি নিল রাক্ষসী তিস্তা। দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙার পর এই জায়গাত কোনোমতে মাথা গুঁজে আছনু। সেটাও চলি গেছে নদীত। হামারঘরে দুঃখ দেখার মতো কেউ নাই। চোখের সামনত ঘর দুইটা নদীত চলি গেল, কিছুই করবার পানু না।"
তিস্তার এই আগ্রাসী রূপ নিয়ে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, "তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কোনোভাবেই এই ভাঙন ঠেকানোর সম্ভব নয়। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব ২০২৭ সালের শুরুতেই নিজস্ব অর্থায়নে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে চাই। অন্যথায় এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্ট কোনোভাবেই লাঘব হবে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন