প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সাতক্ষীরা, ২০ জুলাই, ২০২৬ : টানা ২০ দিনের বৃষ্টির ফলে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার নিম্নতল অঞ্চল ব্যাপক জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ইটাগাছা এলাকার বাসিন্দাদের চলাচল করতে হচ্ছে ভেলায়। বাজার করা, গবাদিপশুর খাবার সংগ্রহ করা, শিশুদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা অন্যান্য জরুরি কাজ সবকিছুই করতে হচ্ছে ভেলায়।
এদিকে জলাবদ্ধতার জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। কিছু বাড়ি ডুবে গেছে। ফলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। পৌরসভার অচল হয়ে পড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং শহরতলিতে পরিকল্পনাহীনভাবে মাছের ঘের গড়ার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে বিভিন্ন ভুক্তভোগী জানান।
অতিবৃষ্টির কারণে জেলায় দুই শতাধিক মৎস্য ঘেরে কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে ঘের মালিকদের। এছাড়া, ৬ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ও সবজির ক্ষেত প্রবল বর্ষণে তলিয়ে গেছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বাসসকে জানান, গত ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই ভোর ৬ টার মধ্যে জেলায় মোট ৪৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার ইটাগাছা এলাকার বাসিন্দা ও জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলীনুর খান বাবুল বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিবছর জলাবদ্ধতার কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। পৌরসভার মধ্যে কোনো মৎস্য ঘের করার নিয়ম নেই; তবুও কিছু ব্যক্তি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মৎস্য ঘের করে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে রেখেছে। এ কারণে পৌরসভার এক তৃতীয়াংশ পানির নিচে রয়েছে।
তিনি মন্তব্য করেন, শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার পাশাপাশি নদী-খাল খনন ও দখলের পরিকল্পনার অভাবের কারণে মানুষ বছরের পর বছর জলাবদ্ধতায় ভুগছে। ইতোমধ্যে টানা বর্ষণের ফলে পৌরসভার ইটাগাছা, কামান নগর, কুখরালী, রসুলপুর, মেহেদিবাগ, মধু মোল্লার ডাঙ্গী, বকচরা, বাঁকাল, পলাশপোল, রইচপুর, পুরাতন সাতক্ষীরা, রাজার বাগান, বদ্দিপুর কলোনি, ঘুটির ডাঙ্গী এবং কাটিয়া মাঠ পাড়াসহ নিম্নাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় সাতক্ষীরার নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার আটকা পড়েছে।
আলীনুর খান বলেন, কিছু লোক পানি নিষ্কাশনের পথে বাধা দিয়ে পরিকল্পনাহীনভাবে মৎস্য ঘের প্রতিষ্ঠা করার ফলে এবং নদী ও খালের নেভাচ্চন করার জন্য জলাবদ্ধতা ঘটেছে।
বদ্দীপুর কলোনি এলাকার বাসিন্দা জবেদা খাতুন মন্তব্য করেন, বিগত এক যুগ ধরে তারা জলাবদ্ধতার শিকার। বৃষ্টি হলেই এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। রান্না-বান্না করতে সমস্যা হয়। ছেলে-মেয়েরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। পৌরসভার মধ্যে বসবাস করেও তারা কোনো নাগরিক সেবা পাচ্ছেন না।
রইচপুর এলাকার বাসিন্দা শাহিনুর রহমান জানান, রইচপুরের নিম্ন অংশে একাধিক মাছের ঘের রয়েছে। এই ঘেরগুলোর কারণে পানির নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থা থাকার কারণে পানির গুণগত মান খারাপ হয়ে ঘরে ঘরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে।
জেলা নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা জানান, শহরের মধ্যে বাবরের বাইরে ভবন নির্মাণ এবং শহরতলিতে যত্রতত্র মৎস্য ঘের তৈরি জলাবদ্ধতার মূল কারণ। জলাবদ্ধতার কারণে স্কুল-কলেজে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা বিপাকে পড়ছে। জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য খালগুলো গভীর করে খনন এবং খাল থেকে জাল-যন্ত্র অপসারণের সুপারিশ করেছেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন জানান, অতিবৃষ্টির কারণে জেলার ৬৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে আশাশুনি উপজেলায় ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২০টি বিদ্যালয় জলাবদ্ধতার কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের চেয়ার ও বেঞ্চ ডুবে যাওয়ায় ক্লাস চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও শিশুদের কথা চিন্তা করে শিক্ষকেরা কষ্ট করে হলেও ক্লাস পরিচালনা করছেন। সদর উপজেলার বাগডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারেননি শিক্ষকেরা।
জেলা মৎস্য অফিসার জিএম সেলিম বাসসকে জানান, বৃষ্টির পানিতে জেলার দুই শতাধিক মৎস্য ঘের ভেসে গেছে, যার আনুমানিক ক্ষতি প্রায় কোটি টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে এবং কিছু সবজির ক্ষেত পচে গেছে।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ জানান, ইতোমধ্যে পানি নিষ্কাশনের জন্য নেট-পাটা অপসারণসহ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি জানান, চিংড়ি চাষের স্বার্থে খালে নেট-পাটা বসিয়ে যারা পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছেন, তাদের তা স্বেচ্ছায় অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, কিছু ঘের মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে যে, তারা চিংড়ি চাষের জন্য খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত করে লাখো মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। তাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হচ্ছে, আপনারা তাড়াতাড়ি নিজেদের দায়িত্বে ঘের ও খালের অবৈধ বাঁধ এবং নেট-পাটা খুলে দিতে হবে। যদি খালের পানি প্রবাহে বাধাসৃষ্টির কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং আইনগতভাবে যা প্রয়োজন তা সম্পন্ন করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন