প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : গির্জার বাইরের একটি স্থানে বসে সারধাদেবী থাদচানামূর্তি হাতে লেখা চার পৃষ্ঠার তালিকা থেকে একে একে নামগুলো পড়তে শুরু করেন। তালিকায় শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ১২৪ জন স্বামী, বাবা ও ভাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার বাট্টিকালোয়া থেকে এএফপি জানায়, ষাটের কোঠায় থাকা এই তামিল নারী পরে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে তুলে নেন। তিনি আরও তিনজনের সঙ্গে যোগ দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় ব্যস্ত শহর বাট্টিকালোয়ার সড়কে ‘ন্যায়বিচারের দাবিতে পদযাত্রা’ শুরু করেন। নিখোঁজ স্বজনদের পরিণতি জানতে তাদের এ ধারাবাহিক প্রতিবাদের রোববার ছিল টানা ১ হাজার ৬০৪তম দিন।
১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের যুদ্ধ চলেছিল। তামিলরা দেশটির প্রধানত হিন্দু ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘু জনগণ।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক ছিলেন।
এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) হাতে কয়েক দশ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন, অপহৃত হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অথবা নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার ১৫ বছরেরও বেশি সময় পার হলেও নিখোঁজদের অধিকাংশের পরিণতি এখনো অজানা।
অভিযোগ, আদালতে আবেদন, প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সরকারের বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি, কোনোটিই এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারেনি।
‘তাকে আর কখনো দেখিনি’
থাদচানামূর্তির জীবনের ঘটনা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে উত্তর খুঁজতে পরিবারগুলোর দীর্ঘ সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি।
১৯৯২ সালের জুলাইয়ে তার ৩৪ বছর বয়সী স্বামী নাল্লাথাম্বির গুলিবিদ্ধ মরদেহ তাদের কৃষিজমিতে পাওয়া যায়। তার মাথায় গুলি করা হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, একজন সেনাসদস্য তাকে হত্যা করেছেন। স্বামীকে হত্যার অভিযোগ নিয়ে স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের কাছে যান।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল, “আপনি যদি বলেন আপনার স্বামীকে একজন সেনাসদস্য হত্যা করেছে, তাহলে তারা আর কখনো তাঁকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেবে না।”'
তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করি। স্বামীর মরদেহ উদ্ধার করি এবং ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ পাই, যা বর্তমান বিনিময় হারে ১৫১ ডলার। এরপর তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।’
২০০০ সালের জানুয়ারিতে তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে নাভানীথান নিখোঁজ হন। থাদচানামূর্তির বিশ্বাস, তামিল বিদ্রোহীরা নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তাঁকে অপহরণ করেছিল।
তিনি বলেন, ‘তাঁকে আমি আর কখনো দেখিনি। ২০১৬ সালে আমি কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। জবাবে তারা জানায়, তার পরিণতি অজানা। আমাকে শুধু নিখোঁজ হওয়ার একটি সনদ দেওয়া হয়েছিল, সত্যটা নয়।’
লক্ষ্মী সিলভার অভিজ্ঞতাও খুব বেশি ভিন্ন নয়। ১৯৯০ সালের জুলাইয়ে কলম্বো যাওয়ার পথে বাসে থাকা অবস্থায় তার স্বামী নিখোঁজ হন। একটি চেকপোস্টে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়।
লক্ষ্মী বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাকে বলেছিলেন, তারা “টাইগার” ছিল।’ তিনি তামিল বিদ্রোহীদের বোঝাতে এ শব্দ ব্যবহার করেন।
পুলিশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে তাঁর করা আবেদনগুলোর কোনো জবাব মেলেনি। যাঁদের কাছে তিনি গিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে ঝামেলা না বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
১৯৯৪ সালে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তার স্বামীর মৃত্যু সনদ দেন। সেখানে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল ‘অজ্ঞাত’। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ষাটের কোঠায় থাকা লক্ষ্মী সিলভা স্বীকার করেন, ‘আমি এখন আর মনে করি না যে তিনি ফিরে আসবেন।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমি শুধু সন্তানদের জন্য বেঁচে আছি।’
তবে অন্যরা এখনো নীরবতা মেনে নিতে রাজি নন।
৬১ বছর বয়সী রাজেশ্বরী চিত্রাভাদিভেল বলেন, ‘আমি সব সময় আশা ধরে রেখেছি।’
তার দেয়ালে কয়লা দিয়ে আঁকা গোঁফওয়ালা এক হাস্যোজ্জ্বল পুরুষের প্রতিকৃতি ঝুলছে। ছবিতে স্ত্রী ও মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেনাকাটা করতে গিয়ে মুখোশধারী ব্যক্তিদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর থেকে রাজেশ্বরীর স্বামী নিখোঁজ।
১৯৯৮ সালে কর্তৃপক্ষ তাকে একটি মৃত্যু সনদ দেয়। এর দুই বছর পর রেড ক্রস তাকে শনাক্ত করার জন্য এক ব্যক্তির মরদেহ দেয়। সংস্থাটি জানায়, সেটি তার স্বামীর মরদেহ হতে পারে।
রাজেশ্বরী বলেন, ‘মরদেহটি চেনার উপায় ছিল না। তাই আমি এখনো বিশ্বাস করি।’
এ ধরনের ঘটনার বিচার ও সত্য উদ্ঘাটনের দাবিতেই নারীরা প্রতিদিন প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এ আন্দোলনের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ‘মাদার্স অব দ্য প্লাজা দে মায়ো’ আন্দোলনের মিল রয়েছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দেশটির সামরিক স্বৈরশাসনের সময় নিখোঁজ হওয়া সন্তানদের পরিণতি জানতে ওই নারীরাও বছরের পর বছর বিক্ষোভ করেছিলেন।
‘এক গভীর নীরবতা’
নিয়মিত পদযাত্রায় অংশ নেওয়া আন্দোলনকর্মী সারালা ইমানুয়েল বলেন, ‘আমরা গোপনে আশা করেছিলাম, হাজার হাজার মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। কিন্তু স্পষ্টতই তা ঘটেনি।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু কিছুই বদলায়নি, এখনো এক গভীর নীরবতা বিরাজ করছে।’
২০০৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে শ্রীলঙ্কার নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধকালীন অপরাধ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
২০২৪ সালে অনুরা কুমারা দিসানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন করে আশার সঞ্চার হয়।
দেশটির প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ হওয়া এবং হামলার’ তদন্ত এবং একটি স্বাধীন জাতীয় কৌঁসুলি দপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
দুই বছর পর গত সেপ্টেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে সরকার ‘দায়মুক্তির অবসান ঘটানোর জরুরি প্রয়োজন’ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।
প্রস্তাবিত স্বাধীন কৌঁসুলি দপ্তর সম্পর্কে এএফপির প্রশ্নের জবাব দেয়নি শ্রীলঙ্কার আইন মন্ত্রণালয়।
তামিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাসামানিক্কাম আর. শানাকিয়ান বলেন, ‘দুয়েকটি আলোচিত মামলায় কিছু তদন্ত হচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই নেই।’
তিনি বলেন, ‘পরপর আসা সরকারগুলো কোনো পদক্ষেপ নিতে ভয় পায়।’ তিনি উল্লেখ করেন, দেশটির অধিকাংশ মানুষ সিংহলি বৌদ্ধ এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক।
তিনি বলেন, ‘তারা জানে, এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই ফিরে আসবে।’
‘জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন’
২০১৮ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিণতি নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়ে সরকার নিখোঁজ ব্যক্তিবিষয়ক দপ্তর (ওএমপি) প্রতিষ্ঠা করে।
দপ্তরটির হিসাবে, তাদের কাছে বর্তমানে ২২ হাজার নিখোঁজের মামলা নথিভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের হিসাবে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
গত তিন বছরে দপ্তরটি মাত্র ২৪ জনের সন্ধান পেয়েছে।
দপ্তরটির সদস্য মিরাক রহিম স্বীকার করেন, ‘যেসব পরিবার দুই, কখনো কখনো তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য এটা স্পষ্ট যে কাজ যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক নথি হারিয়ে গেছে এবং মানুষ নিজেদের স্মৃতি থেকে ঘটনাগুলো পুনর্গঠন করেছে।’
ক্লান্ত হলেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাদচানামূর্তি পদযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা চাই না, শুধু সত্য ও ন্যায়বিচার চাই। আমাদের দুর্ভোগের ভার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দিতে আমি রাজি নই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন