প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ভালো জীবনের আশায় ইতালি পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় তরুণ। অথচ সেই স্বপ্ন বর্তমানে পরিণত হয়ে গেছে দুঃস্বপ্নে। অবৈধ পথে লিবিয়ায় যাওয়ার পর প্রায় আট মাস ধরে তাঁরা মানব পাচারকারী চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে রয়েছেন। মুক্তিপণের টাকা আদায়ে তাঁদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এই নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে জনপ্রতি ২৭ লাখ টাকা দাবি করছে চক্রটি।
জিম্মি হওয়া তরুণদের মধ্যে রয়েছেন- খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে শাহাদাত হোসেন (২০), মাহবুবুর রহমানের ছেলে মানিকুল ইসলাম (২০), হারুনুর রশিদের ছেলে মো. সোহেল (২৭), ছবু মিয়ার ছেলে তাজ মোহাম্মদ (২৫), সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে ফয়সাল (২০) এবং লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে মেহেদী হাসান (২১)।
শাহাদাত হোসেন খিলা ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হারুনুর রশিদের ভাগনে। অপরদিকে মেহেদী হাসান তার শ্যালক। হারুনুর রশিদ জানান, প্রতিদিনই জিম্মি হওয়া ছয় তরুণের ওপর নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সেই ভয়াবহ দৃশ্য ভিডিও করে তাদের স্বজনদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে জানানো হয়েছে, প্রত্যেকের জন্য ২৭ লাখ টাকা দিলে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে। অন্যথায় তাদেরকে হত্যা করে মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সপ্তাহখানেক আগে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ প্রদান করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাঁদের কাছে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপের খবর আসেনি।
পরিবারগুলোর মতে, কেউ আট মাস আগে, আবার কেউ ৯ মাস আগে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে তাঁদের ইতালিতে পাঠানোর কথা ছিল। এজন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু তারা প্রায় ২০ দিন আগে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা ধারণা করছেন, দালালদের যোগসাজশেই এই ঘটনা ঘটেছে।
স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখার পর সম্প্রতি ছয় তরুণকে আরেকটি মানব পাচারকারী চক্রের কাছে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাদের ওপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। মুক্তিপণের টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন তাঁদের নির্যাতনের ভিডিও এবং ছবি পরিবারের কাছে পাঠানো হচ্ছে। কখনো ভিডিও কল চালু রেখে স্বজনদের সামনে তাঁদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা দেখানো হচ্ছে।
হারুনুর রশিদ বলেন, ছয় পরিবারের কেউ নতুন করে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করার সামর্থ্য রাখে না। আগেই ঋণ, ধারদেনা ও জমিজমা বিক্রি করে দালালদের টাকা দেওয়া হয়েছিল। এখন তারা চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান অভিযোগ করে জানান, গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিক ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তার ভাই সামছুল আলমের মাধ্যমে প্রায় ৯ মাস আগে ২০ লাখ টাকা নেন। একই গ্রামের মানুষ হওয়ায় তারা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু এরপর তাকে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন ছেলের নির্যাতনের ভিডিও দেখে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়ছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত মানিক বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। দেশে তার হয়ে বিদেশে লোক পাঠানোর কার্যক্রম পরিচালনা করেন তার ভাই সামছুল আলম।
এদিকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সামছুল আলমসহ অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
মেহেদী হাসানের বাবা শাহ আলম জানান, ১৮ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সব লেনদেন ছিল সামছুল আলমের মাধ্যমে। এখন মুক্তিপণের দাবিতে তার ছেলেকে উলঙ্গ করে নির্যাতন করা হচ্ছে। পরিবারের সুখের আশায় বিদেশে পাঠানো ছেলেকে এভাবে নির্যাতিত হতে হবে, তা কখনো তিনি ভাবেননি।
মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ জানান, বিষয়টি তিনি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন