প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
চিজ বা পনিরের কথা বললে সাধারণত পিৎজা, পাস্তা এবং বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের ছবি মনে আসে। কিন্তু যদি এক কেজি পনিরের দাম এক হাজার ইউরোরও বেশি হয়, তাহলে তা অবশ্যই বিস্ময়কর। আরও বিস্ময়কর হলো, এই পনিরটি গরু বা ভেড়ার দুধে তৈরি নয়, বরং বিরল প্রজাতির গাধার দুধে উৎপাদিত।
বিশ্বের অন্যতম দামি পনিরের নাম ‘পুলে’। সার্বিয়ার জাসাভিকা এলাকায় উৎপাদিত এই বিশেষ পনিরের নামের অর্থ ‘গাধার বাচ্চা’। দুষ্প্রাপ্য গাধার সংখ্যা, অল্প পরিমাণ দুধ, জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং বিরলতার কারণে এর দাম এত বেশি।
যেভাবে শুরু পুলের গল্প
পুলের উৎপত্তি ১৯৯৭ সালে ঘটে। সার্বিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ও পরিবেশবিদ স্লোবোদান সিমিচ সার্বিয়ার জাসাভিকা বিশেষ প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বলকান জাতের গাধা সংরক্ষণ করা।
একসময় সেখানে গাধার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২০০-তে পৌঁছায়। তখন সিমিচ ভাবতে শুরু করেন, বিপুল পরিমাণ গাধার দুধ নিয়ে কী করা যায়। পরে বেলগ্রেডের একজন পনির প্রস্তুতকারকের সঙ্গে যৌথভাবে এই দুধ দিয়ে পনির তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এভাবেই তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম গাধার দুধের পনির পুলে।
যে কারণে এত দাম
পুলের দাম এত বেশি হওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো এর উৎপাদন প্রক্রিয়া। একটি গাধী দিনে দুই লিটারেরও কম দুধ দেয়। অন্যদিকে, একটি কেজি পুলে পনির তৈরির জন্য প্রায় ২৫ লিটার দুধ প্রয়োজন।
গাধার দুধ সংগ্রহ করাও সহজ নয়। যন্ত্রের সাহায্যে গাধার দুধ দোয়ানো সম্ভব নয়। গাধার বাচ্চাকে সামনে রেখে মানুষের হাতেই দিনে তিনবার দুধ সংগ্রহ করতে হয়। আবার গাধীর দুধ পেতে তার বাচ্চা হওয়ার পর অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়।
সব মিলিয়ে অল্প দুধ, বেশি শ্রম এবং দীর্ঘ সময়ের কারণে এই পনিরের উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত।
কীভাবে তৈরি হয় পুলে?
পুলে পুরোপুরি গাধার দুধ দিয়ে তৈরি হয় না। এতে প্রায় ৬০ শতাংশ গাধার দুধের সঙ্গে ৪০ শতাংশ ছাগলের দুধ মেশানো হয়।
বিশেষ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে দুধ জমাট বাঁধানো হয়। এরপর প্রায় ৫০ গ্রামের ছোট ছোট পনির তৈরি করা হয়। এগুলোকে বিশেষ ছাঁচে ঢেলে সোনালি পিরামিডের মতো আকৃতি দেওয়া হয়।
স্বাদ ও গঠনের দিক থেকে এটি কিছুটা স্পেনের মানচেগো পনিরের মতো। পনিরটি তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর, হালকা হলদেটে এবং স্বাদে মৃদু মিষ্টি-টক।
গাধার দুধে গরুর দুধের তুলনায় ভিটামিন সি-এর পরিমাণও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুরুতে খেতে চাননি অনেকেই
পুলে তৈরির শুরুতে সিমিচের বন্ধুরা এই পনির খেতে আগ্রহী ছিলেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর খ্যাতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ধনী রুশ ব্যবসায়ী থেকে ইউক্রেনের ব্যাংকার—অনেকেই শুধুমাত্র এই পনিরের স্বাদ নিতে সার্বিয়ার ওই খামারে ছুটে আসেন বলে জানা যায়।
সার্বিয়ায় স্থানীয়ভাবে পাতলা করে কাটা পুলে পনিরের সঙ্গে শূকর বা গাধার মাংসের সসেজ এবং স্থানীয় ফল থেকে তৈরি ব্র্যান্ডি পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে।
ক্লিওপেট্রা ও হিপোক্রেটিসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ইতিহাস।
গাধার দুধ নিয়ে বহু পুরোনো নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা সৌন্দর্য ধরে রাখতে গাধার দুধে গোসল করতেন। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসও গাধার দুধকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে এসব ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে পুলে পনিরের আধুনিক জনপ্রিয়তার সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চাইলেই মিলবে না এই পনির
পুলের বিরলতার আরেকটি কারণ হলো এর আইনি সীমাবদ্ধতা। সার্বিয়ার সরকারি দুগ্ধজাত পণ্যের তালিকায় গরু, ছাগল ও ভেড়ার দুধের উল্লেখ থাকলেও গাধার দুধের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে আইনি অনুমোদন বা স্বীকৃতি নেই।
ফলে এই পনির বিদেশে রপ্তানি করা বা বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই পুলের স্বাদ নিতে হলে সার্বিয়ার জাসাভিকা সংরক্ষণ এলাকার সেই খামারেই যেতে হয়।
অল্প দুধ, বিরল গাধার জাত, কঠিন উৎপাদন প্রক্রিয়া, সীমিত সরবরাহ এবং আইনি বাধা—সব মিলিয়ে পুলে শুধু একটি পনির নয়, খাবারের জগতের এক বিরল ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন