প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৭৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অগভীর পানির প্রায় সব প্রবালপ্রাচীর চরম বিপন্ন হওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়নে, বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থাকে ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এটি ঝুঁকি মূল্যায়নের সর্বোচ্চ শ্রেণি।
প্রবাল তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল এবং মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রবালের ক্ষতিকর ব্লিচিং বা বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে ও তীব্র হচ্ছে।
আইইউসিএনের প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রের লাল তালিকা মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক প্রধান মিশাল গুদকা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ হুমকি ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে এবং তা অত্যন্ত গুরুতর। এর ফলে এসব বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কপ-১৭ সম্মেলনে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া ‘সুপার’ এল নিনো পরিস্থিতির উদ্ভবও এ বছর প্রবালের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইইউসিএন কপ-১৭ সম্মেলনে তাদের এ মূল্যায়ন তুলে ধরেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় বন্ধ ও তা পুনরুদ্ধারে ঐতিহাসিক চুক্তির বাস্তবায়নে অগ্রগতি অর্জনের জন্য সম্মেলনে সরকারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
মূল্যায়নের জন্য আইইউসিএন জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মধ্যম মাত্রার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়ে দেওয়া গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে বর্তমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলে চলতি শতাব্দীতে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে বুধবার জাতিসংঘ সতর্ক করেছে।
আইইউসিএন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাপীয় চাপ বিশ্বজুড়ে প্রবালপ্রাচীরের অবক্ষয়ের সবচেয়ে ধারাবাহিক হুমকি।’
সংস্থাটি জানায়, অতিরিক্ত মাছ ধরাও প্রবালের ক্ষতি করছে। কারণ, কিছু তৃণভোজী মাছ ও শিকারি প্রাণী শৈবালের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
প্যারটফিশ ও অন্যান্য গ্রুপার মাছ অতিরিক্ত আহরণের ফলে বিশ্বের ৬৩ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে। উপকূলীয় উন্নয়ন, দূষণ, পর্যটন এবং ঘন ঘন শক্তিশালী ঝড়ও প্রবালপ্রাচীরের জন্য বড় হুমকি।
চরম বিপন্ন প্রবালপ্রাচীর
আইইউসিএনের বিশ্লেষণে ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ১২৭টি প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসব প্রবালপ্রাচীরের মোট আয়তন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬২ বর্গকিলোমিটার।
বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধিক জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কয়েকটি প্রবালপ্রাচীরকেও ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোরাল ট্রায়াঙ্গল, ক্যারিবীয় অঞ্চলের মেসোআমেরিকান ব্যারিয়ার রিফ ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগরের প্রবালপ্রাচীর।
শক্ত প্রবাল, যেগুলো প্রবালপ্রাচীরের জীবন্ত ভিত্তি তৈরি করে, বেশির ভাগ বিলুপ্ত হয়ে সেখানে শৈবাল, ভাঙা প্রবালের টুকরো ও স্পঞ্জের আধিক্য দেখা দিলে একটি প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র ধসে পড়েছে বলে বিবেচিত হয়।
গত সপ্তাহে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রবাল প্রজাতি বিলুপ্তির ‘বর্ধিত আপেক্ষিক ঝুঁকিতে’ ছিল। এ অবক্ষয়ের প্রধান কারণ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন।
এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে
গুরুতর সতর্কতা সত্ত্বেও আইইউসিএন বলেছে, বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলের প্রবালপ্রাচীর এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস বাদ দিয়ে শুধু গত ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন বিবেচনা করলে বিশ্বের ২৪ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রকে ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হতো। ভবিষ্যৎ উষ্ণায়নের প্রভাব যুক্ত করায় এ হার বেড়ে ৯৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
গুদকা বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে সংরক্ষণ প্রচেষ্টা ও জলবায়ু কার্যক্রম জোরদার করার জন্য এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা দাঁড় করেছে।’
তিনি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় সমুদ্র গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা কর্ডিও ইস্ট আফ্রিকার গবেষণা পরিচালকও।
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী কয়েক বছরে আমরা যে পদক্ষেপ নেব, তা নির্ধারণ করবে শতাব্দীর শেষভাগে এসব বাস্তুতন্ত্র কেমন থাকবে—আমরা যেভাবে এগুলোকে চিনি, সেভাবে টিকে থাকবে, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে, যার মূল্য প্রকৃতি ও মানুষের কাছে কম হবে।’
আইইউসিএনের মহাপরিচালক গ্রেথেল আগুইলার বলেন, প্রবালপ্রাচীরকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, কী করা প্রয়োজন—নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা জোরদার করা এবং সহনশীল উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও এগুলোর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন