প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
বরিশাল, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে নৌকায় বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠী হলো মান্তা সম্প্রদায়। এ মান্তা সম্প্রদায়ের নদীই তাদের ঘর, আর নৌকা তাদের ঠিকানা। জীবিকার তাগিদে যারা কাটে ভাসমান জীবন—মৃত্যুর পর স্বজনদের শেষ বিদায় জানাতে তাদের পড়তে হতো চরম অনিশ্চয়তায়।
স্থায়ী কবরস্থান না থাকার কারণে প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হতো দাফনের জায়গা খুঁজে বের করার অসহনীয় দুশ্চিন্তা ও দুর্ভোগ। বরিশালের নদীনির্ভর মান্তা সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ লাঘবে এবার এগিয়ে এসেছে উপজেলা প্রশাসন। তাদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে একটি স্থায়ী কবরস্থান।
নদীর বুকে জীবন, মৃত্যুর পরও ছিল না নিশ্চয়তা:
বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাট, চরবাড়িয়া ও আশপাশের নদ-নদীতে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বসবাস করে আসছে মান্তা সম্প্রদায়। নৌকাকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন-জীবিকা। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা এ জনগণের অনেকেরই স্থায়ী বসতভিটা নেই। প্রতিকূল প্রকৃতি, আর্থিক সংকট ও নানা সামাজিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করেই কাটে তাদের প্রতিদিনের জীবন।
কিন্তু জীবনের সংকটের পাশাপাশি মৃত্যুর পর দাফনের জায়গা না পাওয়ার কষ্ট ছিল আরও নির্মম। স্বজন হারানোর মুহূর্তে যেখানে শেষ বিদায় জানানোর কথা, সেখানে উপযুক্ত কবরস্থানের অভাবে তাদের পড়তে হতো অনিশ্চয়তায়। কখনো কখনো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাত যে মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিও তৈরি হতো।
মান্তা সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্থায়ী কবরস্থানের অভাব এবং শুধু জমির সংকট ছিল না; এটি ছিল মানবিক মর্যাদা, ধর্মীয় রীতি পালন ও স্বজনদের শেষ বিদায় জানানোর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
এক একর জমিতে আশার নতুন ঠিকানা:
মান্তা সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় কবরস্থান স্থাপনের কাজ চলছে। উপজেলার সিংহেরকাঠী আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন খাসজমিতে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে এ কবরস্থানটি।
উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে নদীতে বসবাসকারী মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের স্বজনদের দাফনের জন্য পাবেন একটি নির্দিষ্ট স্থান। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে সম্মানজনকভাবে সমাহিত করার সুযোগ তৈরি হবে তাদের জন্য।
শুধু মান্তা সম্প্রদায় নয়, কবরস্থানটি ছিন্নমূল যেকোনো মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে নদীনির্ভর প্রান্তিক জনগণের পাশাপাশি সমাজের অসহায় ও ভূমিহীন মানুষের জন্যও এটি হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।
বরিশালের মান্তা সম্প্রদায়ের সরদার জসিম সর্দার ও জাকির হোসেন বাসসকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদীতে নৌকায় বসবাস করছি। আমাদের নিজেদের স্থায়ী কোনো বসতভিটা নেই। পরিবারের কেউ মারা গেলে তাকে কোথায় দাফন করব, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো। অনেক সময় দাফনের জন্য অন্যের জমির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। স্থায়ী কবরস্থান না থাকায় আমাদের এ কষ্ট দীর্ঘদিনের।
তারা বলেন, উপজেলা প্রশাসন আমাদের জন্য কবরস্থানের ব্যবস্থা করায় আমরা আনন্দিত। এটি চালু হলে মৃত্যুর পর অন্তত স্বজনদের সম্মানের সঙ্গে দাফন করতে পারব। আমরা চাই, দ্রুত কবরস্থানটির নির্মাণকাজ শেষ করে এটি ব্যবহারের উপযোগী করা হোক।’
দ্রুত উদ্বোধনের আশা প্রশাসনের:
বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা সুলতানা বাসসকে বলেন, কবরস্থানটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি উদ্বোধন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মান্তা সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ছিন্নমূল যেকোনো মানুষও কবরস্থানটি ব্যবহার করতে পারবেন। পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলাবাসীর সার্বিক সহযোগিতাও কাম্য।
প্রশাসনের এ উদ্যোগকে মান্তা সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানের পথে অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে কবরস্থানটি পুরোপুরি চালু হলে এর প্রকৃত সুফল পাবেন সেই মানুষগুলো, যাদের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে নদীর বুকে, আর মৃত্যুর পর স্বজনদের শেষ আশ্রয়টুকু নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা।
শেষ বিদায়ে মিলবে একটুকরো মাটি:
মান্তা সম্প্রদায়ের জীবন নদীর সঙ্গে বাঁধা। নদীই তাদের জীবিকা, নদীই তাদের বসবাসের পরিসর। কিন্তু নদীর বুকে ভাসমান এ জীবনেও মৃত্যুর পর স্বজনদের জন্য একটি নির্দিষ্ট কবরস্থানের নিশ্চয়তা থাকা জরুরি।
সিংহেরকাঠীতে প্রায় এক একর জমিতে নির্মাণাধীন কবরস্থানটি চালু হলে সেই নিশ্চয়তার পথ খুলবে। দীর্ঘদিনের দাফন সংকট থেকে স্বস্তি পাবেন নদীনির্ভর প্রান্তিক জনগণের এ মানুষজন। প্রিয়জন হারানোর শোকের মুহূর্তে অন্তত দাফনের জায়গা খুঁজে বের করার অসহায়তা পোহাতে হবে না তাদের।
নদীতে যাদের জীবন কাটে, মৃত্যুর পর তাদের স্বজনদের শেষ ঠিকানা হবে একটুকরো মাটি—বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ মান্তা সম্প্রদায়ের কাছে তেমনই এক মানবিক প্রত্যাশার নাম।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন