প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঢাকা, ১ নভেম্বর, ২০২৬ : ‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’- এই প্রবাদবাক্যটি জীবনের পথে চলতে অনেকের জন্য সফলতার চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা এমন একটি উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তারা নিজেদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে গ্রামের তরুণদের জন্য একটি খেলার মাঠ নির্মাণের অনন্য নজির তৈরি করেছেন। এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সারা দেশের জন্য একটি রোলমডেল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দাদের প্রশংসা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন বিষয়টি জানলেন, তখন তিনি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হককে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পাঠান। এর ফলস্বরূপ, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় দেলদুয়ার উপজেলায় সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাঠের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আজ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। তিনি দেলদুয়ারের এই মহৎ উদ্যোগের জন্য উদ্যোক্তা ক্যাটাগরিতে তাদের পুরস্কৃত করার কথাও জানান। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যুথী এবং বাবুপুর গ্রামের মাঠ তৈরির উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মহৎ উদ্যোগের সফলতার জন্য সবাই একত্রিত হলে তা সম্ভব হয়। এই চিন্তা মাথায় রেখে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাবুপুরের কিছু গ্রামবাসী খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাঠমুখী করতে বাবুবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই অংশগ্রহণ করেন।
মাঠ তৈরির অন্যতম উদ্যোক্তা মো. খোরশেদ আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘এই গ্রামে বাচ্চাদের খেলার সুযোগ-সুবিধা ছিল না। খাস জমিতে ফসল কাটার পর যে ১৫ দিন জমিটি খালি থাকত, সে সময় সেখানে সবাই খেলাধুলায় মেতে উঠত। কিন্তু পরে আবারও সেই একই চিত্র দেখা যেত। ফলে তরুণরা খেলাধুলার সুযোগ না পেয়ে মাদকাসক্ত ও অন্যান্য অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ত।’
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে আমরা অনেকে মিলে তরুণদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিই। আয়োজিত সভায় সকলের অংশগ্রহণ তাদের উৎসাহিত করে তোলে। ২০০, ৪০০, ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সকলেই চাঁদা দিতে থাকলে ঐ সভায় প্রায় ৮ লাখ টাকা তহবিলে জমা হয়। এমনকি একজন চা বিক্রেতাও ২০০ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এভাবে প্রায় দেড় মাসের মধ্যে ৩২ লাখ টাকা সংগৃহীত হয়, যেখানে প্রবাসীসহ আশপাশের গ্রামবাসীও অবদান রেখেছেন।
সেই টাকা দিয়ে ইকবাল হোসেন সুজনের ৫৯ শতাংশ জমি ক্রয় করে মাঠের জন্য জায়গা নেয়া হয়। গত ২৯ অক্টোবর সকলে মিলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ও জাতীয় সংগীত বাজিয়ে জমিটিকে স্থায়ীভাবে খেলার মাঠের জন্য নির্ধারণ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা জুথী বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে বাসসের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, ‘শিশু ও কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য স্থায়ী খেলার মাঠের অভাব পূরণের জন্য বাবুপুর গ্রামের সাধারণ জনগণ বাবুপুর মৌজার ১৮১৬ নং দাগের ৫৯ শতাংশ জমি ক্রয়ের জন্য স্থানীয়দের উদ্যোগে ৩২ লাখ ১৬ হাজার টাকা উত্তোলন করে। যদিও খেলার মাঠের জন্য জমি দলিল করে দেওয়া হয়নি। ২৯ অক্টোবর জমিটি খেলার মাঠের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছে।’
সরকারের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ তৈরির যে উদ্যোগ রয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ তৈরিতে বাবুপুরে ৫৯ শতাংশের সাথে আরও ১৮০ শতক জায়গা প্রয়োজন।
জোহরা সুলতানা জুথী বলেন, ‘পাকা রাস্তা থেকে জমিটি ২৫০ ফুট পূর্বদিকে অবস্থিত ১৮১৬ নং দাগটি বর্তমানে ফসলি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ধান রয়েছে। এটি তিন ফসলি আবাদি জমি। ১৮১৬ দাগের আশেপাশে কোনো সরকারি খাস জমি নেই। দাগের আশপাশে ‘খ’ তফসিলভুক্ত জমি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে, যার শ্রেণি নামা ও কান্দা। ২০২৫-২৬ সালে বাবুপুর মৌজার কান্দা শ্রেণির প্রতি শতকের বাজার মূল্য ৬৩ হাজার ২১২ টাকা ও নামা শ্রেণির মূল্য ৩১ হাজার ৮৭৫ টাকা।
ঐ দাগের আশেপাশে ১৩০৩ নং দাগের ২২ শতক জমি, ১৮১৭ নং দাগের ৩২ শতক জমি, ১৮১৮ নং দাগের ৩১ শতক জমি, ১৮১৩ নং দাগের ২০ শতক জমি, ১৮২১ নং দাগের ৩১ শতক জমিসহ মোট ১৮০ শতক জমি রয়েছে। ২৩৯ শতক জমি নিয়ে মাঠ তৈরি করা হলে বাকি ১৮০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে খেলার মাঠ বানাতে হবে। এজন্য ১৮০ শতক কান্দা শ্রেণির জমির মূল্য তিনগুণ হিসেবে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮০ টাকা।
এছাড়া ১৩০২ নং দাগের জমিতে একটি বাড়ি রয়েছে। সে হিসেবে অবকাঠামো, গাছপালার মূল্য হিসেবে আরও প্রায় ৬০ লাখ টাকার প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৪১ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৮ টাকা প্রয়োজন।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী পুরো বিষয়টি জেনে অচিরেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। এ ধরনের একটি মহৎ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলার সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যদেরও তা অনুকরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ‘এভাবেও এগিয়ে আসা যায়, বিষয়টি আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। খেলার মাঠের জন্য বাবুপুর গ্রামের মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকার ও মন্ত্রণালয় সবসময় এমন ইতিবাচক কাজকে উৎসাহ দিতে চায়। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা যদি এই গ্রামবাসীর পাশে থাকতে পারি, তা হবে বিশেষ কিছু। একইসাথে বাবুপুর গ্রাম পুরো দেশের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন