প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঢাকা, ২ নভেম্বর, ২০২৬ : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমাগত বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া প্রান্তিক জনগণের বহুমুখী সংকট নিরসন ও তাদের জীবন সংগ্রামের বাস্তবতা তুলে ধরার লক্ষ্যে এবং তাদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ৮ দফা দাবিতে আজ ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে একটি নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর দরিদ্র মানুষের সংকট’ শীর্ষক এই নাগরিক সংলাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) এবং চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন (সিডব্লিউএফ)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন। সভাপতিত্ব করেন বারসিক-এর পরিচালক মো. কামরুজ্জামান এবং সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম। সিডব্লিউএফ-এর চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী সংলাপে ধারণাপত্র পাঠ করেন।
সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক কারণে গ্রামের প্রান্তিক মানুষ শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই জনগণের জন্য মানসম্মত বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
এ সময় তিনি বস্তি এলাকায় উচ্চ ভবন নির্মাণের মাধ্যমে স্বল্প জমিতে বেশি মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারের কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।
সংলাপে ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া প্রান্তিক জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবারের প্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা তাদের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেন।
গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় (সিডর, আইলা, আম্পান, রেমল), তীব্র লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ বস্তিবাসী গ্রাম থেকে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন, বরিশাল, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কয়রা থেকে বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ নগরে এসে জরাজীর্ণ ঘর, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, চরম তাপপ্রবাহ এবং বর্ষাকালে দূষিত পানি থেকে চর্মরোগ ও ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
বক্তারা জানান, গ্রাম ছাড়ার পর এই মানুষরা কেবল বাসস্থানই হারাননি, বরং হারিয়েছেন তাদের বহু বছরের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শহরে এসে তারা জরাজীর্ণ ঘর, অনিরাপদ পানি, অপরিশোধিত স্যানিটেশন, তীব্র তাপ প্রবাহে হিটস্ট্রোক, বর্ষায় ড্রেনের বর্জ্যমিশ্রিত পানিতে চর্মরোগ ও ডেঙ্গুর মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। পাশাপাশি, দিনমজুর ও রিকশাচালকদের অনিয়মিত আয়, অপরাধের ভয়াবহতা এবং সমাজ ও নাগরিক পরিবেশের তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাদের আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বস্তিবাসীর পক্ষ থেকে সভার প্রধান অতিথির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের কাছে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষতিপূরণ দাবির জন্য ১৩ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করা হয়।
স্মারকলিপির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- জলবায়ু আক্রান্ত মানুষের জন্য অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা ও শস্যবীমার জন্য আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানো, উন্নত অভিযোজন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রদান, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড সহজলভ্য করা এবং জলবায়ু তহবিলের শর্ত শিথিল করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে সরাসরি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া ধারণাপত্রে নগর দরিদ্রদের জন্য ৮ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা, নগর স্থানীয় সরকারের অধীনে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ, নিজস্ব এলাকা বা নিকটবর্তী শহরে আবাসন ও পুনর্বাসন, বস্তির ঘর ও অবকাঠামোর মানোন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষাসুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, আগাম আবহাওয়া সতর্কবার্তা, উচ্ছেদহীন স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে সরাসরি বস্তিবাসীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ বস্তিবাসী সুরক্ষা কমিটির সভাপতি হোসনে আরা বেগম রাফেজা, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দেলনের (বাপা) ট্রেজারার আমিনুল রসুল, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লেলিন চৌধুরী, কাপ’র নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, কালের কণ্ঠের সাংবাদিক নিখিল ভদ্র, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের কনভেনর মিহির বিশ্বাস এবং নাগরিক সংলাপের সভাপতি ও বারসিক পরিচালক মো. কামরুজ্জামান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন