প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
পাকিস্তানের কিশোরী জারা শাহর (ছদ্মনাম) অনলাইনে কম্পিউটার গেম খেলতে গিয়ে এক অপরিচিত ব্যক্তির সাথে পরিচিত হয়। প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা চললেও পরে ওই ব্যক্তি জারার কাছে নগ্ন ছবি চাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ছবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল শুরু করে অপরাধী। সে জারাকে মানসিকভাবে চাপ দিতে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ চলতি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, পাকিস্তানে গত এক বছরে আনুমানিক ১৫ লাখ শিশু অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ১৭ বছর বয়সী জারা তাদের মধ্যে একজন।
জারা জানায়, ‘অনলাইনে গেম খেলার সময় আমাদের কথাবার্তা শুরু। প্রথম দিকে সে আমার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করে। কিছুদিন পর সে দেখা করার কথা বলে এবং একপর্যায়ে আমার নগ্ন ছবি চাইতে শুরু করে।’
সে আরও জানায়, ছবি দিতে রাজি না হওয়ায় ওই ব্যক্তি হুমকি দেয়, অনলাইনে তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে তাদের জানিয়ে দেবে তাদের মধ্যে কী ধরনের কথা হয়েছে।
ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ভুক্তভোগী শিশুদের ৮৫ শতাংশের ক্ষেত্রে নিপীড়ক ছিলেন তাদের পরিচিত কেউ। বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন, অনলাইন গেম খেলার সময় পরিচয়, উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অর্থের প্রলোভন কিংবা প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে শিশুদের ফাঁদে ফেলে অপরাধীরা।
ইউনিসেফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড্যানিয়েল কারডেফেল্ট এএফপিকে বলেন, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন, গেম খেলার সময় আলাপ, উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, অর্থ কিংবা প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে নিপীড়ন শুরু হতে পারে।’
অপরাধীরা সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের প্রকাশ করা ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় কয়েক মাসও লেগে যায়। পরে সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে গোপন ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেয় তারা।
এরপর এসব কনটেন্ট পরিবার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে আরও ছবি বা ভিডিও পাঠাতে, শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে কিংবা অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। এ ধরনের অপরাধকে ঘিরে একটি সংগঠিত শোষণচক্র গড়ে উঠেছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
লাহোরভিত্তিক শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা পহচানের পরিচালক মেহেক নাঈম জানান, এক বছরে নথিভুক্ত হওয়া যৌন নিপীড়নের প্রায় ৪৪ শতাংশই অনলাইনে ঘটেছে। এসব ঘটনায় হোয়াটসঅ্যাপ ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্ম বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশের কারণে মেয়েরা এ ধরনের অপরাধের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে। ঘটনা প্রকাশ পেলে অনেক সময় তাদের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, এমনকি স্কুল ছাড়তেও বাধ্য করা হয়।
জারার ক্ষেত্রেও পরিবারের কাছে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার ভয়ই তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। তার আশঙ্কা ছিল, পরিবার জানতে পারলে হয়তো তার স্কুলে যাওয়া কিংবা বাড়ির বাইরে বের হওয়াও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭৪ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। চলতি মাসে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে একটি প্রস্তাব পাস করেছে।
ডিজিটাল অধিকারকর্মী ওসামা খিলজি এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলেন, ‘আমি এ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে একমত নই। এটি কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন এবং শিশুরা ভিপিএন ব্যবহার করে খুব সহজেই এ বাধা এড়িয়ে যাবে। তা ছাড়া শিশুদের মতপ্রকাশের যে স্বাধীনতা রয়েছে, এ নিষেধাজ্ঞা তা কেড়ে নেবে।’
প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ দমনে পাকিস্তানে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অলাভজনক সংগঠন মুসলিম হ্যান্ডসের মুখপাত্র তাহিরা আফ্রাসিয়াব বলেন, ‘এটির কোনো বাস্তবায়ন নেই।’
আইনজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান আইনেও রয়েছে নানা ফাঁকফোকর। মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী সালমান আফ্রিদি বলেন, শিশুদের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে মাত্র ১০ হাজার রুপির বিনিময়ে তাদের দিয়ে যৌন কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তির এমন এক অপব্যবহার দেখছি, যেখানে শিশুদের প্রলুব্ধ করা, ব্ল্যাকমেইল, কনটেন্ট তৈরি ও তা বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পুরো একটি চক্র কাজ করছে। একে স্পষ্টভাবেই শোষণের একটি বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেম বলা যায়।’
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লোকলজ্জা, পরিবার ও সমাজের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে পাকিস্তানে গত এক বছরে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া ৭১ শতাংশ শিশু বিষয়টি কাউকে জানায়নি। জরিপে অংশ নেওয়া কোনো শিশুই পুলিশ, হেল্পলাইন বা সমাজকর্মীদের মতো আনুষ্ঠানিক কোনো মাধ্যমে অভিযোগ করেনি।
ফলে অনলাইনে গেম বা সাধারণ কথোপকথন দিয়ে শুরু হওয়া পরিচয় অনেক শিশুর জন্য দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। জারার ভাষায়, ‘আমি তখনো যেমন ভয় পেয়েছি, এখনো পাচ্ছি। আমি আসলে এক চরম আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে আছি।’
সূত্র: এএফপি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন