প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
মানুষকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যের মনে আঘাত করা, তা কথা, আচরণ কিংবা কাজের মাধ্যমে হোক, কেবল সম্পর্কের অবনতি ঘটায় না, বরং এর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে। এজন্য একজন মুমিনের কর্তব্য হলো নিজের কথা ও আচরণে অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
অর্থ: ‘যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৮
কথায় কষ্ট দেওয়াও বড় অপরাধ
মানুষকে কষ্ট দেওয়ার প্রধান উপায়গুলোর মধ্যে একটি হলো কথাবার্তা। গালি দেওয়া, অপমান করা, গীবত করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, কটূক্তি করা, উপহাস করা কিংবা কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করা—এসবের মাধ্যমে একজন মানুষের মনে গভীর আঘাত সৃষ্টি হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন—
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
অর্থ: ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৪
তাহলে রাগের সময়েও মুখের কথার প্রতি সতর্ক থাকা আবশ্যক। কারণ মুখ দিয়ে বলা একটি কথা কখনো কখনো মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
গীবত ও অপবাদ থেকে বাঁচতে হবে
কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষের কথা বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে, সেটিই গীবত। আর যে দোষ তার মধ্যে নেই, সেটি তার নামে বলা হলো অপবাদ।
রাসুলুল্লাহ (সা:) গীবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন—
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ
অর্থ: ‘তোমরা কি জান, গীবত কী? ... তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
অর্থ: ‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দ কর।’
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২
অপমান ও উপহাসও নিষিদ্ধ
কাউকে ছোট করা, তার দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা কিংবা মন্দ নামে ডাকা ইসলামে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَىٰ أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১১
একই আয়াতে আল্লাহ মন্দ নামে ডাকা থেকেও নিষেধ করেছেন।
চোগলখুরীর পরিণতিও ভয়াবহ
একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগিয়ে দিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করা বা মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করাও গুরুতর অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন—
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ
অর্থাৎ, ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫
এছাড়া হাদিসে এসেছে, চোগলখুরীর কারণে কবরে শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কেয়ামতের দিন নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন
মানুষকে কষ্ট দেওয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—ইবাদত করেও কেউ কেয়ামতের দিন নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন—
‘আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত নিঃস্ব সে ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে বা কাউকে মারধর করেছে। এরপর তার নেক আমল থেকে একে একে ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১
অর্থাৎ, মানুষের হক নষ্ট করে শুধু নিজের ইবাদতের ওপর ভরসা করার সুযোগ নেই।
তাহলে কথা ও কাজে সতর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মুমিনের উচিত কারও মনে কষ্ট না দেওয়া, গালি ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকা, গীবত-অপবাদ না করা, কাউকে উপহাস বা তুচ্ছ না করা এবং মানুষের সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা।
কারও প্রতি অন্যায় করে থাকলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়; সম্ভব হলে যার হক নষ্ট করা হয়েছে, তার কাছেও ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত।
মানুষের হৃদয় ভাঙা সহজ, কিন্তু সেই ক্ষত সারানো কঠিন। তাই কথা বলার আগে ভাবুন—আপনার একটি কথা কারও মনে আজীবনের কষ্ট হয়ে থাকবে কি না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন