প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
একসময় পরিবারে সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটা বা মেয়েটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা হতো। স্বপ্ন ছিল, একদিন সে দেশের বড় চিকিৎসক, গবেষক কিংবা স্বনামধন্য অন্য কোনো পেশায় নিযুক্ত হবে। তবে এখন সেই স্বপ্নের শেষ গন্তব্য দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং হয়ে উঠছে কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের কোনো শহর। বিমানবন্দরের বিদায় মুহূর্তে যখন চোখে পানি থাকে, তখনও অনেকের মনে একটাই কথা ঘুরতে থাকে—হয়তো আর ফেরা হবে না।
বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা গত কয়েক বছরে অপরিসীমভাবে বেড়েছে। ইউনেসকোর তথ্য বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৭০ থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ বাংলাদেশিকে স্টাডি পারমিট দিয়েছে। তাছাড়া ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ১৭ হাজারেরও বেশি পৌঁছেছে। এটি তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬% বেশি এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ। কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানও বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
এটি সম্ভব হয়েছে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ উদ্যোগের জন্য। তারা একের পর এক স্কলারশিপ দিচ্ছে, টিউশন ফি কমাচ্ছে, এবং পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগও দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পোস্ট স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট কিংবা কানাডার স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তরুণদের কাছে নিরাপদ ভবিষ্যতের একটি প্রতিশ্রুতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গায় রয়েছে। যারা বিদেশে যায়, তাদের একটি বড় অংশ আর ফিরছে না। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের প্রতি ব্যাচের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে খুব কম শিক্ষার্থীই দেশে ফিরে আসে বলেও একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কেবল শিক্ষার্থীরাই নয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও বিদেশে থাকার প্রবণতা বেড়েছে। কেউ কেউ উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য বিদেশে চলে যান এবং ফেরেন না, আবার কেউ পিএইচডি করে বিদেশেই স্থায়ী হয়ে যান।
এটির পেছনে শুধুমাত্র টাকার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপদ জীবনের আকাঙ্ক্ষা। দেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেও চাকরি পাচ্ছে না। আর চাকরি পেলেও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট, গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও প্রতিযোগিতার চাপ অনেক শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। ফলে বিদেশের পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস, নির্ভরযোগ্য জীবনব্যবস্থা ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ তাদের কাছে একেবারে স্বপ্নের মতো হয়ে গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বলে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ, একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলো ধীরে ধীরে অন্য দেশের হয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতে, এই ‘ব্রেইন ড্রেইন’ কেবল কয়েকজন মেধাবীর দেশত্যাগ নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে সমগ্র অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করছে। কারণ যখন একটি দেশ নিজের সেরা মেধাগুলো ধরে রাখতে পারে না, তখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের মধ্যেও এক ধরনের অনাস্থা জন্মায়, যেখানে মনে হয়, ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে হলে দেশ ছাড়তেই হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন