প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
এক সময় গ্রামাঞ্চলে শীতলপাটির ব্যাপক চাহিদা ছিল। গরমের দিনগুলোতে মেঝেতে শীতলপাটি বিছানো স্বস্তি দিত, এবং এটি বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। প্লাস্টিক, ফোম ও আধুনিক উপকরণের প্রভাবের কারণে শীতলপাটির ব্যবহার কমে গেছে, ফলে এর সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবনও সংকটে পড়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চার শিক্ষার্থী এই হারাতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা শীতলপাটির প্রচলিত ব্যবহারকে ছাড়িয়ে নান্দনিক স্যান্ডেল তৈরি করছেন। ঐতিহ্যবাহী উপকরণকে আধুনিক নকশা ও ব্যবহারিক প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের এই উদ্যোগ পুরোনো গল্পকে নতুনভাবে বুনে দেওয়ার চেষ্টা।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী। তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নাম ‘বুনন বাজার’। দলের সদস্য অপূর্ব কৃষ্ণ দে ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী। বাকি তিনজন ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের আবির দে, মো. আশিক মিয়া ও চৌধুরী খুবাইব বিন করিম। তাদের উদ্যোগের মাধ্যমে শীতলপাটিকে নতুনভাবে নকশা করে স্যান্ডেল তৈরি করা হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের বাড়ি থেকে ভাবনার শুরু
শীতলপাটি থেকে স্যান্ডেল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অপূর্ব কৃষ্ণ দের হাত ধরে। তার বাড়ি টাঙ্গাইলে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, পরিবারের অনেক সদস্য মূর্তা বা বেতি গাছ চাষ এবং শীতলপাটি তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। শীতলপাটির কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে কারিগরদের কাজ; সবকিছুই ছিল তার পরিচিত।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি লক্ষ্য করেন, শীতলপাটির প্রচলিত ব্যবহার কমে যাচ্ছে। এই চিন্তা থেকেই তার মাথায় নতুন ভাবনা আসে। তিনি ভাবেন, ঐতিহ্যবাহী উপকরণকে যদি নতুন কোনো পণ্যে ব্যবহার করা যায়?
সেই ভাবনা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নকশা তৈরি, উপকরণ সংগ্রহ, নমুনা বানানো—একটির পর একটি ধাপ পেরিয়ে তারা এগোতে থাকেন শীতলপাটির স্যান্ডেল তৈরির দিকে।
শীতলপাটি দিয়ে স্যান্ডেল বানানোর চিন্তাটা কিভাবে মাথায় এলো জানতে চাইলে অপূর্ব কৃষ্ণ দে আরটিভিকে বলেন, "শীতলপাটি দিয়ে স্যান্ডেল বানানোর মূল চিন্তাটা প্রথমে আমার মাথায় আসে। আমার বাড়ি টাঙ্গাইলে। আমাদের পরিবারের অনেকেই মূর্তা বা বেতি গাছ চাষ এবং শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। ছোটবেলা থেকেই শীতলপাটির কাঁচামাল এবং কারিগরদের কাজ খুব কাছ থেকে দেখে এসেছি। সেখান থেকেই একটা চিন্তা আসে যে শীতলপাটিকে যদি শুধু প্রচলিত ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক কোনো পণ্যে রূপান্তরিত করা যায় কিনা।"
শীতলপাটি থেকে পায়ের উপযোগী স্যান্ডেল
শীতলপাটি সাধারণত মেঝেতে ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও, মানুষের পায়ের চাপ, হাঁটার সময় বাঁকানো এবং নিয়মিত ব্যবহার; সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সেটিকে স্যান্ডেলে রূপ দেওয়া সহজ ছিল না।
প্রথম দিকে মাপ, আকৃতি, কাটিং, ফিতার অবস্থান ও তলার কাঠামো নিয়ে একাধিকবার নমুনা তৈরি করতে হয়েছে। নিজেদের ব্যবহার, বন্ধুদের মতামত এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নকশা বদলাতে হয়েছে।
অপূর্ব বলেন, "প্রথম দিকে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল শীতলপাটিকে আরামদায়ক ও টেকসই স্যান্ডেলে রূপ দেওয়া। মাপ, আকৃতি, কাটিং, ফিতার অবস্থান ও তলার কাঠামো নিয়ে কয়েক দফা নমুনা তৈরি করে পরীক্ষা করতে হয়েছে। নিজেরা ব্যবহার করে দেখা, ক্রেতাদের মতামত নেওয়া এবং বারবার সংশোধনের মাধ্যমে নকশা ও গঠনে উন্নতি আনা হয়েছে। একই সঙ্গে শীতলপাটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও বুনন বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।"
তাদের কাছে শুধু স্যান্ডেল তৈরি করাই লক্ষ্য ছিল না। শীতলপাটির নিজস্ব সৌন্দর্য যেন নষ্ট না হয়, আবার পণ্যটিও যেন ব্যবহারকারীর কাছে আরামদায়ক হয়—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
চার শিক্ষার্থীর কাছে শীতলপাটির স্যান্ডেল শুধু একটি পণ্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প এবং সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের গল্প।
তাদের স্যান্ডেলে তাই একদিকে রয়েছে আধুনিক নকশা, অন্যদিকে শীতলপাটির পরিচিত বুনন। দেশীয় কারুশিল্পকে নতুন প্রজন্মের রুচি ও ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত করাই তাদের মূল ভাবনা।
দলের আরেক সদস্য আশিক মিয়া আরটিভিকে বলেন, "আমাদের কাছে এটি শুধু একটি স্যান্ডেল নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি শিল্প ও কারিগরদের গল্প জড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণ না করে আধুনিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য। তাই শীতলপাটিকে নতুনভাবে ব্যবহার করে এমন একটি পণ্য তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।"
শুরুতে ছিল সংশয়, এখন সহযোগিতা
নতুন কোনো ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করলে সংশয় থাকা স্বাভাবিক। শীতলপাটি দিয়ে স্যান্ডেল তৈরির বিষয়টিও শুরুতে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল।
তবে প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং ক্রেতাদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর তাদের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজ চালিয়ে যাওয়া অবশ্য সহজ নয়। ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের নকশা, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের পরিকল্পনাও করতে হচ্ছে তাদের।
অপূর্ব বলেন, "শুরুতে শীতলপাটি দিয়ে স্যান্ডেল তৈরির ধারণাটি পরিবার ও বন্ধুদের কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও, প্রোটোটাইপ তৈরি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং গ্রাহকদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর তাদের আগ্রহ ও সহযোগিতা বেড়ে যায়। বন্ধুরা প্রোটোটাইপ ব্যবহার করে আরাম, নকশা ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে মতামত দিয়েছেন।"
বাজারে যখন নানা ধরনের স্যান্ডেল পাওয়া যায়, তখন একজন ক্রেতা কেন শীতলপাটির স্যান্ডেল কিনবেন; প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক।
আশিকের মতে, "শুধু শীতলপাটি দিয়ে তৈরি বলেই একজন ক্রেতা স্যান্ডেলটি কিনবেন—এমনটা তারা মনে করেন না। বরং পণ্যের আরাম, ব্যবহারযোগ্যতা ও নকশাকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।"
তিনি বলেন, "ক্রেতারা শুধু শীতলপাটি দিয়ে তৈরি বলেই স্যান্ডেলটি কিনবেন—এমন নয়। আরাম, ব্যবহারযোগ্যতা ও আধুনিক নকশাকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি এই স্যান্ডেলে দেশীয় কারুশিল্প, স্বতন্ত্র নকশা ও ঐতিহ্যের গল্প যুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য হলো, ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করে এমন একটি স্যান্ডেল তৈরি করা, যা দেশীয় হওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী।"
তাদের কাছে ঐতিহ্য পণ্যের পরিচয়ের একটি অংশ; কিন্তু পণ্যটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সেটিকে ব্যবহারকারীর প্রয়োজনও পূরণ করতে হবে।
প্রতিযোগিতা পেরিয়ে বাজারের পথে
‘বুনন বাজার’ এখন আর শুধু চার শিক্ষার্থীর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এরই মধ্যে সাড়া পেয়েছে তারা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছে ‘বুনন বাজার’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্লাব আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায়ও সেরা আটে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। সেখানে আকিজ রিসোর্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় চার সদস্যই পেয়েছেন ইন্টার্নশিপের সুযোগ।
গত ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও প্রদর্শিত হয়েছে তাদের উদ্যোগ। সেখানে দর্শনার্থীদের কাছ থেকেও পেয়েছে প্রশংসা। এই পথচলায় অর্থায়নের পাশাপাশি আর্থ সোসাইটির মেন্টরশিপ ও ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে সামনে রয়েছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। পণ্যের মান ঠিক রেখে উৎপাদন খরচ কমানো, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো এবং আরও বেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছানো এখন তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এক সময় যে শীতলপাটি ছিল কেবল ঘরের শীতলতার উপকরণ, সেটিই এখন হয়ে উঠছে ফ্যাশন ও সৃজনশীলতার অংশ। ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে নয়, বরং তাকে নতুনভাবে ব্যবহার করেই যে বাঁচিয়ে রাখা যায়—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চার শিক্ষার্থীর উদ্যোগ যেন তারই একটি ছোট্ট উদাহরণ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন