প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
॥ হারুন আল নাসিফ ॥
ঢাকা, ০১ নভেম্বর, ২০২৬ : দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নে জনসম্পৃক্ততার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে উলশী-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্পের ৫০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে যশোরের শার্শা উপজেলায় তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান খনন কাজের উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পটি স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে পরবর্তীতে ‘উলশী মডেল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
পাঁচ দশক আগে খাদ্য ঘাটতি, কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকটের সমাধানের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। খাল খননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে উন্নয়নকাজে সরাসরি সম্পৃক্ত করে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যও ছিল।
স্বাধীনতার পর দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি ছিল এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম উদ্যোগ।
উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্প ছিল স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক এ কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
উলশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বেতনা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি খননে স্থানীয় কৃষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। হাজারো মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে কোদাল ও ঝুড়ি নিয়ে খননকাজে যোগ দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, কাজের সময় স্বেচ্ছাশ্রমে অংশগ্রহণকারীদের দুপুরে রুটি ও গুড় দেওয়া হতো।
প্রায় ছয় মাসের মধ্যে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে খননকাজ সম্পন্ন হয়। এর ফলে উত্তর শার্শার পাঁচটি বড় বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি হয় এবং প্রায় ২২ হাজার একর জমিতে চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়। খালের দুই পাশে সেচের জন্য প্রায় ২০টি পাম্প স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে এলাকায় ইরি-বোরো ধানের চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।
স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে ওঠা ‘উলশী মডেল’
খাল খননের ওই কর্মসূচির বিশেষত্ব ছিল উন্নয়নকাজে সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ। কোনো ঠিকাদারি শ্রমিক নির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমে কাজটি বাস্তবায়িত হয়। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে ‘উলশী মডেল’ নামে পরিচিতি পায়।
উলশী গ্রামের শতবর্ষী বাসিন্দা আবদুল বারিক মন্ডল ওই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে গ্রামে এসেছিলেন। তিনি নিজেই কোদাল হাতে মাটি কাটেন এবং মাটি ভর্তি ঝুড়ি বহনেও অংশ নেন।
বারিক মন্ডলের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, খননকাজের সময় জিয়াউর রহমান তার ভাই করিম বকস মণ্ডলের মাথায় মাটি ভর্তি ঝুড়ি তুলে দিয়েছিলেন। এ সময় করিমের মাথায় থাকা স্থানীয়ভাবে ‘টোকা’ বা ‘মাথাল’ নামে পরিচিত বাঁশ ও তালপাতার তৈরি ঐতিহ্যবাহী টুপিটিও তিনি নিজের মাথায় পরেন। ঘটনাটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
শার্শা উপজেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও প্রবীণ নেতা খায়রুজ্জামান মধু বলেন, ‘উলশীর খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন। এই খাল খনন হয়েছিল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, কৃষিকে টিকিয়ে রাখার জন্য।’
খাল খননের সময় জিয়াউর রহমান স্থানীয় একটি ভবনে রাত যাপন করেন। পরে ভবনটি কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে কৃষকদের নিয়ে বৈঠক ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হতো। বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল। ফলে খাল খননের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষকদের সংগঠিত করার কাজেও স্থানটি ভূমিকা রাখে।
উলশী প্রকল্পের পর দেশজুড়ে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়। কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ১৯৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৬৭৫ দশমিক ১৮ মাইল। এ পরিসংখ্যান দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির বিস্তারের একটি চিত্র তুলে ধরে।
দীর্ঘ অবহেলার পর পুনঃখননের উদ্যোগ
সময়ের সঙ্গে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটিতে পলি জমে পানি প্রবাহ ব্যাহত হয়।
একপর্যায়ে খালটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দিতে থাকে। খালের পাড়ের স্মৃতিচিহ্ন ও ঐতিহাসিক ভবনটির অবস্থাও নাজুক হয়ে যায়। এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে খালটি পুনরুদ্ধার ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, ঐতিহাসিক খালটির পুনঃখননের জন্য বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি প্রস্তাবও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
যশোর-৩ (যশোর সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, উলশী খাল পুনঃখনন এবং যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আধুনিকায়ন ছিল জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনী অঙ্গীকার। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে যশোরের উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
পাঁচ দশক পর নতুন অধ্যায়
উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে গত ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খালটির পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। তিনি কোদাল হাতে প্রথম মাটি কেটে এ কাজের সূচনা করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ঐতিহ্যবাহী টোকা মাথায় ও হাতে কোদাল নিয়ে খালের দুই পাড়ে সমবেত হন।
উদ্বোধন উপলক্ষে দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাতও অনুষ্ঠিত হয়।
পাঁচ দশক আগে জিয়াউর রহমানের উদ্বোধন করা খালটির পাশে পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধনী স্মারক স্থাপন করা হয়েছে। উদ্বোধন উপলক্ষে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুনঃখনন সম্পন্ন হলে খালটির পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে এবং মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে খালটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক উন্নয়ন উদ্যোগের স্মৃতি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
পাঁচ দশক আগে উলশী-যদুনাথপুরে যে উদ্যোগের মধ্য দিয়ে উন্নয়নকাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছিল, তার ৫০ বছর পূর্তিতে পুনঃখনন কর্মসূচি সেই ঐতিহাসিক প্রকল্পকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন