প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অধিকাংশ এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য নতুন ও বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকার রাখাইনে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিলেও, নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি।
২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বর্তমানে দেড় মিলিয়নের বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির তথ্যমতে, বাংলাদেশের দেওয়া তালিকা থেকে কয়েক লাখ ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ব্যক্তিকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় সংকট এখন রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাতের কারণে রাজ্যটির বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের নিজ গ্রাম ও বসতভিটায় ফেরানোর জন্য শুধু মিয়ানমার সরকারের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষগুলোর অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং সামগ্রিক সংকট সমাধান অনেকাংশে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার।
এদিকে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মানবাধিকার মূল্যায়নেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, আটক এবং বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ উঠে এসেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ভূমি দখল এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ এলাকায় ফিরে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রধান শর্ত হচ্ছে—নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা এবং নিজস্ব বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। কিন্তু রাখাইনে এখনো এসব শর্ত পূরণ হয়নি। বিশেষ করে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারাও ফিরে যেতে আস্থা পাচ্ছেন না।
গত আগস্টে রোহিঙ্গা সংকটের নবম বর্ষপূর্তিতে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। অতীতে একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় কোনো রোহিঙ্গাই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়নি।
কক্সবাজারের সীমান্ত পরিস্থিতিও আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করছে। গত কয়েক মাসে মিয়ানমার জলসীমায় আটক বাংলাদেশি জেলে ও রোহিঙ্গাদের আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ফেরত আনতে হয়েছে বিজিবিকে। সর্বশেষ আগস্টে ২৪ জন জেলেকে আরাকান আর্মির কাছ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আরাকান আর্মি শত শত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে আটক করেছে, যাদের একটি অংশ পরে ফেরত এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাখাইনের বর্তমান বাস্তবতায় আরাকান আর্মিকে উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের যে এলাকায় বসবাস করতে হবে, তার বড় অংশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বর্তমানে সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িত।
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ বা সংলাপের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে কোনো পক্ষ না নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা।
জাতিসংঘও বলছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে প্রত্যাবাসন হতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে।
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার ৪ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হলেও এই চাপ আর বহন করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। তাদের কারণে আমরা সামাজিকভাবে পরিবেশ, আইন শৃঙ্খলাসহ নানা ধরণের চাপে আছি। দ্রুত প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান। রাখাইনে পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তিনি সরকারের প্রচেষ্টার সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আরো সক্রিয় হওয়ার কথা তুলে ধরেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথ খুলতে হলে শুধু মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যথেষ্ট হবে না। রাখাইনের প্রকৃত নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাস্তবতা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ—সবকিছুর সমন্বিত সমাধান প্রয়োজন। অন্যথায় প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ওপর চলমান রোহিঙ্গা সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে.
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন