প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬’ কার্যকর হওয়ার ফলে দেশে লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নিকটাত্মীয়ের বাইরে ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার অঙ্গ দানের আইনি সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও সাশ্রয় হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।
আইনটি পাস হওয়ার পর কেবল সরকারের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট অনুমোদিত হাসপাতালগুলোই মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করতে পারবে।
কে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন
আইনের বিধান অনুযায়ী, সুস্থ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো জীবিত ব্যক্তি যদি তার অঙ্গ বিযুক্তির ফলে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি না থাকে, তাহলে তিনি নিকটাত্মীয়ের দেহে অঙ্গ দান করতে পারবেন। একই শর্তে নিঃস্বার্থবাদী দাতারাও নিকটাত্মীয়ের বাইরের গ্রহীতাকে অঙ্গ দান করতে পারবেন। তবে চক্ষু, চর্ম, টিস্যু ও অস্থিমজ্জা সংযোজন বা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় বা নিঃস্বার্থবাদী দাতা হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, "মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬ পাস হওয়ার ফলে দেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনে নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। কারণ আইন যদি আপনাকে সুরক্ষা দেয়, তাহলে কিন্তু কোনো কাজ করতে আর বাধা থাকে না।"
তিনি আরও বলেন, "পাস হওয়া আইনে ইমোশনাল ডোনার বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। ফলে নিকটাত্মীয়ের বাইরে এখন নিঃস্বার্থবাদী দাতার অঙ্গদানের আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।" তিনি উল্লেখ করেন, "আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে দেশে যদি কিডনি, লিভার প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্লান্ট) অধিক হারে হতে থাকে, তাহলে এসব চিকিৎসায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমবে।" ১০ আগস্ট বিএমইউতে প্রথমবারের মতো ‘ইমোশনাল ডোনার’ থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সরকারি অনুদানের অর্থে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিএমইউতে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, "একটি লিভার প্রতিস্থাপন করতে প্রায় দেড়শ ব্যাগ (কম-বেশি) রক্তের সঞ্চয় রাখতে হয়।" তিনি আরও জানান, "৩০ লাখ টাকার মত খরচ লাগতে পারে। এই টাকা দিয়ে যদি দেশে চিকিৎসার সুযোগ হয়, তাহলে মানুষ বিদেশে যাবে কেন?"
তিনি বলেন, "বিদেশে গেলে তো হোটেল ভাড়া, প্লেন ভাড়াসহ অনেক খরচ। দেশেই যদি মানুষ এক্ষেত্রে ভালো সার্ভিস পায় এবং আস্থার জায়গা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে মানুষের এসব চিকিৎসায় বিদেশমুখী হওয়া অবশ্যই কমে আসবে।"
ব্রেইন ডেথ ঘোষণার নিয়ম
আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে হলে (কিছু শর্ত সাপেক্ষে) অন্যূন ১২ ঘণ্টা সুস্পষ্ট কারণে অবিরাম কোমা অবস্থায় থাকতে হবে। ২ বছর হতে ১৩ বছর বয়সী শিশুর ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে হলে শিশুটিকে ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি) পরীক্ষা দ্বারা অন্যূন ১২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
মেডিসিন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, নিউরোলজি এবং এ্যানেসথেশিওলজি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক অথবা সমপদমর্যাদার অন্যূন তিনজন চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কোনো ব্যক্তির ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে পারবে। তবে ব্রেইন ডেথ ঘোষণাকারী কমিটির কোনো চিকিৎসক বা তার কোনো নিকট আত্মীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন বা সংযোজন প্রক্রিয়ার সাথে কোনোভাবে জড়িত থাকতে পারবে না।
কখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিযুক্ত করা যাবে
যদি কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় স্বেচ্ছায় তার কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করে থাকে কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করা ব্যক্তির ব্রেইন ডেথ ঘোষণা হলে তার আইনানুগ উত্তরাধিকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিযুক্ত করার লিখিতভাবে অনুমতি প্রদান করলে অন্য কোনো ব্যক্তির দেহে সংযোজনের উদ্দেশ্যে বিযুক্ত করা যাবে। এছাড়া, ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো দাবিদার না থাকলে ব্রেইন ডেথ ঘোষণাকারী হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পালনকারী ব্যক্তি অথবা চক্ষু, চর্ম, টিস্যু বিযুক্তকরণের ক্ষেত্রে মৃতদেহ অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট কিংবা প্রতিষ্ঠান বা স্থানে থাকলে ওই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্থান যে জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারাধীন তিনি বা তার নিকট হতে এ ব্যাপারে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিযুক্তির জন্য লিখিত অনুমতি প্রদান করলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিযুক্ত করা যাবে।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা-গ্রহীতার যোগ্যতা
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা হিসাবে কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত বিবেচিত হবে যদি, ব্রেইন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির ক্যাডাভেরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বয়স দুই বছর থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হয়। জীবিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বয়স ১৮ বছর থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হলে তিনি দাতা হিসাবে উপযুক্ত হবেন। তবে বিশেষ প্রয়োজনে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতার বয়সসীমা শিথিলযোগ্য।
এছাড়া, মৃত্যুর পূর্বে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে ব্যক্তির পক্ষ হতে কোনো ধরনের লিখিত আপত্তি না করা থাকলে এবং কোনো ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কোনো কারণে নষ্ট হবার সম্ভাবনা না থাকলে, তিনি দাতা হিসাবে উপযুক্ত হবেন। সেই সাথে আইনে উল্লিখিত কিছু রোগে আক্রান্ত না হয়ে থাকলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা হিসাবে যোগ্য হবেন।
অন্যদিকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহীতা হিসাবে কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত বিবেচিত হবে, যদি তার বয়স দুই বছর হতে ৭০ বছর বয়স সীমার মধ্যে হয়। তবে ১৫ বছর হতে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সসীমার ব্যক্তিরা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহীতা হিসাবে অগ্রাধিকার পাবে বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে। তবে কর্ণিয়া, চর্ম ও টিস্যু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।
নিঃস্বার্থবাদী দাতার যোগ্যতা-অযোগ্যতা
আইন অনুযায়ী, নিঃস্বার্থবাদী দাতা হিসাবে কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত বিবেচিত হবে যদি তার বয়স ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে হয়। তিনি যদি মানসিকভাবে সুস্থ হন এবং সজ্ঞানে সম্মতি প্রদানে সক্ষম হন। এছাড়া, যদি তিনি কোনো আর্থিক প্রলোভন বা চাপে না পড়ে স্বেচ্ছায় আগ্রহী হন কিংবা তিনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহীতার নিকট আত্মীয় না হন, তবে দীর্ঘদিনের পরিচিত হলে, তাহলে ওই ব্যক্তি নিঃস্বার্থবাদী দাতা হিসাবে উপযুক্ত বিবেচিত হবে।
এক্ষেত্রে অবশ্যই নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সুপারিশ প্রাপ্ত হতে হবে। অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তি নিঃস্বার্থবাদী দাতা হওয়ার অযোগ্য হবেন যদি তিনি মাদকাসক্ত হন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কিংবা আর্থিক প্রলোভনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে আগ্রহী হয়ে থাকেন।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম জানিয়েছেন, "ডোনারের সংজ্ঞায় সংকীর্ণতার কারণে আগে শুধু নিকট আত্মীয়ের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ডোনেট করার সুযোগ ছিল।" তিনি বলেন, "আমরা চাচ্ছিলাম আইনে ইমোশনাল ডোনেশনের একটা পথ খুলে দিতে।" তিনি আরও বলেন, "হাইকোর্টের রায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ইমোশনাল ডোনার কিডনিসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন।"
ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, "হাইকোর্টের সেই রায়ের আলোকে অবশেষে ‘মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬’ পেয়েছি।" তিনি উল্লেখ করেন, "এখন এই আইনের সুবাদে রোগীদের বিদেশ যাওয়া কমবে এবং চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয় হবে।"
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ
আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, মানব দেহের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় বা তার বিনিময়ে কোনো প্রকার সুবিধা লাভ কিংবা কোনো প্রকার বিজ্ঞাপন প্রদান বা অন্য কোনোরূপ প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অপরাধের দণ্ড
যদি কোনো ব্যক্তি নিকট আত্মীয়তা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে অথবা এমন তথ্য প্রদানে উৎসাহিত, প্ররোচিত বা ভীতি প্রদর্শন করে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য তিনি অনধিক দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এছাড়া, আইন লঙ্ঘন করলে বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে তিনি অনধিক তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের জন্য কোনো চিকিৎসক দণ্ডিত হলে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল কর্তৃক প্রদত্ত তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল হবে।
অন্যদিকে, কোনো হাসপাতালে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সে হাসপাতালের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের অনুমতি বাতিল হবে ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য অর্থ দণ্ড আরোপ করা যাবে। আইন অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত করতে পারবে।
সূত্র: বাসস
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন