প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
"ছেলে যদি অপরাধী হয়, বিচার হোক। আর যদি নির্দোষ হয়, তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।" এই আকুতি এখন মৌলভীবাজারের বড়লেখার দোহালিয়া গ্রামের বৃদ্ধা ফাতেমা বেগমের কণ্ঠে। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার পর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া তার ছেলে হুমায়ুন কবীর, যিনি এনামুল নামে পরিচিত, তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে প্রায় ১৪ বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মামলার অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে হয়নি; কিন্তু কারাগারে থাকা এনামুলের জীবন থেমে গেছে।
পরিবারের দাবি, এত বছর পরেও সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এনামুলের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থার (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো উত্তর ইউনিটের তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার আচরণ অসংলগ্ন ছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, সন্দেহের ভিত্তিতে একজন মানুষকে আর কতদিন কারাগারে থাকতে হবে?
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হন। এই হত্যাকাণ্ড দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তদন্তের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি সন্দেহের আওতায় আসেন। তদন্তের সময় এনামুলের নামও উঠে আসে, যিনি তাদের বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সেই গ্রেপ্তারের পর এক যুগেরও বেশি সময় কেটে গেছে। পরিবারের আশা ছিল, তদন্ত শেষ হবে এবং সত্য বেরিয়ে আসবে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে বিচার হবে; আর যদি নির্দোষ প্রমাণিত হয়, তাহলে এনামুল মুক্তি পাবেন। কিন্তু বছর পেরিয়ে দশক, দশক পেরিয়ে আরও কয়েক বছর—এনামুলের ভাগ্যে মুক্তির আলো ফেরেনি।
কারাগারেই হারিয়ে গেল তারুণ্য
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের পশ্চিম দোহালিয়া গ্রামের মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ এনামুলের জীবন এখন পরিবারের কাছে এক দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়। যে বয়সে সংসার, কর্মজীবন ও স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সের বড় একটি অংশ কেটেছে কারাগারে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ কারাবাসের ফলে এনামুলের মানসিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না এবং আচরণেও অসংলগ্নতা দেখা যাচ্ছে।
এনামুলের মা ফাতেমা বেগম বলেন, "আমার ছেলে দোষী হলে তার বিচার হোক, আমরা কখনো বিচার চাইনি এমন নয়। কিন্তু এত বছরেও যদি তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সন্দেহের কারণে আর কতদিন তাকে জেলে রাখা হবে? আমার ছেলে এখন অসুস্থ। তাকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।"
এনামুলের বাবা মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়াকে ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, সাগর-রুনি হত্যার প্রায় সাড়ে সাত মাস পর, র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, এরপর ২১ দিন তার কোনো সন্ধান ছিল না। পরে ভৈরবের একটি সড়কের পাশে তাকে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে তাকে নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা বিচারিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
এনামুলের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর মকবুল আলী আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। একের পর এক শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন তিনি। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবারের জায়গাজমি ও পুরোনো বাড়ি বিক্রি করতে হয়। প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করার পরও চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান।
স্ত্রী ফাতেমা বেগমের ভাষায়, "ওই ঘটনার পর আমার স্বামী আর আগের মতো ছিলেন না। চিকিৎসা করাতে গিয়ে যা ছিল সব শেষ করেছি। ছেলের জন্যও কিছু করতে পারিনি। ভয় ছিল, আমাদেরও বিপদ হতে পারে।"
এনামুলের বড় ভাই শাহিন আহমদ বলেন, "বাবাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে যায়। এখন আমার ভাইও কারাগারে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। যদি সে নির্দোষ হয়, তাহলে তাকে মুক্তি দেওয়া হোক। অন্তত তার চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হোক।"
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সময়ে ভয় ও আতঙ্কের কারণে তারা এনামুলের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেননি। আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইও চালানো সম্ভব হয়নি।
১১২ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন
সাগর-রুনি হত্যা মামলা দেশের বহুল আলোচিত মামলাগুলোর একটি। হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের দায়িত্ব একাধিক সংস্থার হাতে গেলেও দীর্ঘ সময়েও রহস্যের জট খোলেনি। এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১১২ বার পিছিয়েছে।
একদিকে সাগর-রুনি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষা, অন্যদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া এনামুলের জীবনের প্রায় ১৪ বছর হারিয়ে যাওয়া—দুটি বিষয়ই এখন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
দোহালিয়ার ছোট্ট বাড়িটিতে তাই এখনো পথ চেয়ে বসে আছেন ফাতেমা বেগম। তার চোখে ছেলের ফেরার অপেক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন—সাগর-রুনি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হবে কবে, আর সন্দেহের কারাগারে হারিয়ে যাওয়া এনামুলের জীবনের ১৪ বছরের দায় নেবে কে?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন