প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
কুমিল্লায় দুই দিনের শচীন মেলা-২০২৬ শুরু হয়েছে, যা উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও সুরকার শচীন দেববর্মণের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে নগরীর চর্থায় শিল্পীর পৈতৃক বাড়িতে এই মেলার উদ্বোধন করা হয়।
মেলা উপলক্ষে সংগীত ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হলেও শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির একটি বড় অংশ সরকারি হাঁস-মুরগির খামারের দখলে থাকায় স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, বাড়িটি পুরোপুরি দখলমুক্ত করে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কালচারাল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা উচিত।
শচীন দেববর্মণের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমি দুই দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রতিবছর শিল্পীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার পৈতৃক বাড়িতে বিভিন্ন আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনে অংশ নিতে কুমিল্লা ও আশপাশের এলাকা থেকে সংগীত ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা আসেন।
শুধু সংগীতের জন্য নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে বাড়িটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে একসময় শচীন দেববর্মণের সঙ্গে সংগীতের আসর জমাতেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ তৎকালীন সময়ের খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞরা। সংগীতের নানা স্মৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা বাড়িটি এখনো যথাযথভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা হতাশ।
জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শচীন দেববর্মণের কুমিল্লার পৈতৃক বাড়ির একটি বড় অংশে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। এরপর দীর্ঘ সময় বাড়িটির উল্লেখযোগ্য অংশ খামারের দখলে থেকে যায়, ফলে শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি অনেকটা আড়ালে পড়ে যায়।
পরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে বাড়িটি সংরক্ষণ ও দখলমুক্ত করার দাবি উঠতে থাকে। বিভিন্ন সামাজিক ও সংস্কৃতিক সংগঠনের তৎপরতায় বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। ২০১৩ সালে বাড়িটির একাংশ আংশিকভাবে বেদখলমুক্ত করা হয়। পরের বছর ২০১৪ সালে বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন জেলা প্রশাসন।
সংস্কারকাজের মাধ্যমে বাড়িটির কিছু অংশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও পুরো বাড়ি এখনো সংরক্ষণের আওতায় আসেনি। জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজনের সময় বাড়িটিতে মানুষের আনাগোনা বাড়লেও বছরের অন্য সময় এটি অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালুর দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, ‘শচীন দেববর্মণ শুধু কুমিল্লার নন, তিনি উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। বাড়িটির যে অংশ এখনো খামারের দখলে রয়েছে, তা দখলমুক্ত করে পুরো জায়গাকে একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে নতুন প্রজন্ম শচীন দেববর্মণ সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ তৈরি হবে।’
এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন জানান, শিল্পীর পৈতৃক বাড়িটি সংরক্ষণ এবং সারা বছর সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে গেল ১০ জুলাই শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়িটি পরিদর্শন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। এসময় তিনি বাড়িটি ঘিরে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানান।
শচীন দেববর্মণ ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের চর্থার এই পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান ছিলেন। বাংলা ও হিন্দি সংগীতজগতে অসামান্য অবদান রাখা এই শিল্পী সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
শিল্পীর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এবারের শচীন মেলাও তার স্মৃতি ও সংগীতকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি আয়োজন। তবে সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, প্রতিবছর নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়িকে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন