প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ইউরোপজুড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কম বেতন, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। ফ্রান্সে সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ইউরোপের অন্তত সাতটি দেশের তরুণেরা এতে যোগদান করেছেন।
স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তরুণেরা রাজধানীতে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। ফ্রান্স ও ইতালিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে বড় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্রিসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দের দাবি নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে কিছু তরুণ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবিতে দেশভেদে ভিন্নতা থাকলেও তাঁদের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে মিল রয়েছে—ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তাঁবুর শিবিরে অবস্থান করছেন স্পেনের তরুণেরা। মঙ্গলবার সেখানে ২৭ বছর বয়সী কনসার্ট মঞ্চকর্মী সাচা কোসি বলেন, “ভবিষ্যৎহীন প্রজন্ম আবার ফিরে এসেছে।”
কোসি আরও বলেন, কম বেতন, উচ্চ বাড়িভাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অসহায়ত্ব এবং চাকরির অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। আগের প্রজন্মের মতো সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও তাঁদের শঙ্কা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা সবকিছুতেই ক্লান্ত। পরিস্থিতি ক্রমাগত এমনভাবে বদলাচ্ছে, যা আমাদের কোনো উপকারে আসছে না।”
ইউরোপের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য, পেনশনসহ সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপে সরকারগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর চ্যালেঞ্জ এবং রাশিয়ার আগ্রাসন ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের মিত্র ডেনমার্কের ভূখণ্ড নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমে আসায় ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি কমার প্রেক্ষাপটে ইউরোপে সামরিক ব্যয়ও বেড়েছে, যা সরকারি বাজেটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
ইতালির পাদুয়া শহরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী স্টেলা সালিস বলেন, তরুণদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ও ক্লান্তির অনুভূতি রয়েছে। তাঁর মতে, ইউরোপের তরুণেরা ক্রমেই মনে করছেন, তাঁদের প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
বর্তমান আন্দোলনগুলো বিক্ষোভের সংখ্যা ও স্থায়িত্বের দিক থেকে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ছড়িয়ে পড়া কৃচ্ছ্রসাধনবিরোধী বিক্ষোভের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বেলজিয়ামের তরুণদের উৎসাহিত করেছে। ইতালি ও জার্মানির বিক্ষোভকারীরাও ফ্রান্সে শুরু হওয়া একটি স্লোগান ব্যবহার করছেন। সালিস আশা করছেন, আন্দোলনটি জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হবে।
তবে কিছু দেশে বিক্ষোভের সঙ্গে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। গত সপ্তাহান্তে উত্তর ইতালিতে দাঙ্গার ঘটনায় কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর দেশটির সরকারের মন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থী নেতা মাত্তেও সালভিনি মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য, শহরটিকে অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিবাসনবিরোধী অবস্থানও তুলে ধরেন।
ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলও সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলটির প্রার্থী মেরিন লে পেন রোববার বলেন, ছয় মাসের মধ্যে ফরাসি জনগণ কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ বেছে নিতে পারবেন। দলটির সভাপতি জর্দান বারদেলাও একই দিন দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে তরুণদের সমস্যা সমাধানের পথ সহজ নয়। সীমিত সম্পদের মধ্যে শিক্ষা, পেনশন, আবাসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ বরাদ্দের ভারসাম্য রাখতে হবে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সালোমে রেনো বলেন, তিনি এমন একটি চাকরি চান, যা করতে তাঁর ভালো লাগবে। প্রতি মাসে খরচের হিসাব করে কোনো কিছু কেনার সামর্থ্য আছে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে চান না তিনি।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাতে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তাঁদের একজন ২৯ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞানী মোরানা মন্টেইরো বলেন, তরুণেরা কাজ করতে চান, তবে মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে। তাঁর প্রশ্ন, কাজ করেও যদি বাড়ি কেনা, মাসিক বিল পরিশোধ কিংবা পরিবার গড়ার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে সেই কাজের অর্থ কী?
আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীরা দুর্নীতিবিরোধী বৃহত্তর ‘ফ্লেমিঙ্গো’ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে চলা এই আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে সুরক্ষা ও বাড়তি বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছেন। আন্দোলনটির নাম এসেছে এমন একটি এলাকার পাখির আবাসস্থল থেকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্পের জন্য সরকার অনুমোদন দিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রকল্পটির বিরোধিতা করছে।
২২ বছর বয়সী অভিনেতা ও আন্দোলনকর্মী রেডজান শকেম্বি বলেন, “আমরা এমন একটি প্রজন্ম, যারা নীরব না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” তাঁর ভাষ্য, আগের প্রজন্ম একই মাত্রার স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার ভোগ করতে পারেনি। আলবেনিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দের দাবিতে প্রায় ১৫০ দিন আগে জ্ভেরনেভে শুরু হওয়া বিক্ষোভে তিনি যোগ দেন। তাঁর লক্ষ্য আরও স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক আলবেনিয়া গড়ে তোলা। শকেম্বি বলেন, “আমরা একটি ভালো দেশ চাই এবং আমরা সেই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অবদান রাখতে চাই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন