প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
প্রতি বর্ষায় উজানের ঢল ও নদীভাঙনে উত্তরের বিস্তীর্ণ জনপদ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙনের ফলে প্রতিবছর গ্রামের পর গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, উদ্বাস্তু হচ্ছেন লাখো মানুষ। নদীগুলোর তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে অল্প পানিতেই সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি এই আগ্রাসী ভাঙন ও বন্যা রোধে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো।
পলিতে ভরাট হওয়ার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদ তার নাব্যতা হারাচ্ছে। ১৯৯৯ সালে জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র নদে প্রতিবছর প্রবাহিত হচ্ছে ৭২১ মিলিয়ন টন পলি এবং গঙ্গা নিয়ে আসছে ৩১৬ মিলিয়ন টন। তার মধ্যে ৫১ শতাংশ পলি বাংলাদেশে জমা হয়। বাকি ৫১২ মিলিয়ন টন জমা হয় নদ-নদীর তলদেশে। ২৮ শতাংশ প্লাবন ভূমিতে এবং ২৩ শতাংশ অর্থাৎ ২২৩ মিলিয়ন টন পলি নদীর বুকে জমা হয়। এ কারণে প্রতিবছর নদীর তলদেশ ৩ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার ভরাট হচ্ছে। নদের নাব্যতা হ্রাস পাওয়া ও এই বিপুল পরিমাণ পলি সময়মতো অপসারণের স্থায়ী উদ্যোগ না থাকায় সামান্য বর্ষার পানিতেও ভাটির অঞ্চলগুলো ভয়াবহ প্লাবন ও ভাঙনের শিকার হয়।
নদী অববাহিকার বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। তারা বলছেন, নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ার ফলে অল্প পানিতেই নদী উপচে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। যাতে তাদের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বালাসীঘাটের পাপুল সরকার উল্লেখ করেছেন, নদীর তলদেশ ভরে যাওয়ার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এক বাসিন্দা বলছেন, 'বাড়িঘর ভেঙে নদীতে চলে যাচ্ছে। রাস্তাটাও এখন না টিকতে পারে। আমরা নদী এলাকার লোক, কী করব? আমরা অসহায়।' অন্য এক ভুক্তভোগী বলেন, 'ভিটেমাটি হারিয়ে এখন কী করি! নদী এখন পাগলা। আগে যদি কাজ করতো, জায়গাটা ভাঙতো না।'
অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার মডেলের উদাহরণ দেখা যায়। নেদারল্যান্ডস তাদের বিখ্যাত 'রুম ফর দ্য রিভার' (Room for the River) নীতির মাধ্যমে নদীর অববাহিকা চওড়া ও গভীর করে পানি ধরে রেখেছে। সেই পানি তারা কৃষিকাজ ও নৌ-যোগাযোগে ব্যবহার করছে। চীন, সিঙ্গাপুর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারত কৃত্রিম জলাধার ও নদী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বন্যার পানি জমিয়ে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সেচ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় কাজে লাগাচ্ছে। চীনের উদাহরণ দেখালে, তারা দক্ষিণ অঞ্চলের ইয়াংসি নদীর উদ্বৃত্ত পানি হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ খালের মাধ্যমে উত্তরের শুষ্ক অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক মডেলগুলো অনুসরণ করতে পারে। গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম আব্দুস সালাম বলেন, 'ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলার মতো বড় নদীগুলোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ছোট শাখা নদীগুলোর সংযোগ ঘটিয়ে সেগুলোকে প্রাকৃতিক জলাধার (রিজার্ভার) হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এর ফলে বর্ষার উদ্বৃত্ত পানি শুষ্ক মৌসুমের জন্য ধরে রাখা যাবে।' বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন জানান, 'পানি ব্যবস্থাপনার প্রতি গুরুত্ব দেয়া দরকার। সেই সাথে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বদলে বন্যা ব্যবস্থাপনার দিকে বেশি নজর দেয়া দরকার।'
তিনি আরও বলেন, '৯৬ লাখ বর্গকিলোমিটারের দেশ চীন কীভাবে নদী ব্যবস্থাপনা করেছে, সেখান থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।' গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম এই ব্যাপারে মন্তব্য করেন যে, 'যেহেতু পদ্মা ব্যারেজ হচ্ছে, সরকার চাইলে ধাপে ধাপে এদিকেও মনোযোগ দিতে পারে।'
দেশের মোট পানিপ্রবাহের প্রায় ৬৭ শতাংশই ব্রহ্মপুত্র নদ বহন করে। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক চরে ১০ লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্থায়ী বন্যা ও ভাঙন থেকে রক্ষা করতে হলে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণী পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন