প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
টানা ভারী বর্ষণের কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও জেলা সদরে একরাতেই ঘটেছে পৃথক পাহাড় ধস, যার ফলে ৮ রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যেখানে মাটির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু ঘটেছে আলী আকবর (৫০) নামে এক ব্যক্তির। অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছে তার স্ত্রী জোৎস্না বেগম, যার আকুতি এখন সদর হাসপাতালে বাতাস ভারি করে তুলছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের স্ত্রী জোৎস্না। তিনি বলেন, 'রাতে আমরা স্বামী, ছেলে ও আমি একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে খাটে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ গভীর রাতে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ঘরের ওপর পড়ে, মুহূর্তে আমরা মাটির নিচে চাপা পড়ে যাই।'
তিনি আরও জানান, 'ভাগ্যক্রমে আমি ও আমার ছেলে কোনোমতে বের হয়ে আসতে পারলেও আমার স্বামী মাটির নিচে আটকা পড়ে যান। তিনি বাঁচার জন্য বারবার আকুতি জানাচ্ছিলেন। পরে স্থানীয় লোকজন মাটি খুঁড়ে তাকে উদ্ধার করলেও ততক্ষণে তিনি মারা গিয়েছিলেন।'
এই শহরের ট্র্যাজেডির পাশাপাশি উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও নেমে এসেছে একই রকম অন্ধকার। উখিয়ার ক্যাম্প ১১, সি-১১ ব্লকে রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আমান উল্লাহর পরিবারের ৭ সদস্য। ভারী বৃষ্টিপাতের এক পর্যায়ে পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে ৫ জন। তাদের মধ্যে ৪ জন মারা যান।
সফলভাবে বেঁচে ফেরা আমান উল্লাহ তার পুরো পরিবারের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানান। তিনি বলেন, 'রাতে আমাদের পরিবারের সাতজন সদস্য রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ রাত ১টার দিকে পাহাড়ধসে পুরো ঘর মাটিচাপা পড়ে যায়। আমি ও আমার আরেক ভাই কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যাই, কিন্তু পরিবারের বাকি পাঁচজন মাটির নিচে চাপা পড়েন। আমাদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। মাটি খুঁড়ে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকি চারজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।'
এদিকে, উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা জানান, রাত ২টার দিকে ক্যাম্প ১৫ জামতলীতে পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের ৫ সদস্য। ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় মাটি খুঁড়ে তাঁদের উদ্ধার করা হলেও বাঁচানো যায়নি স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে। অপর ২ জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রাত দুইটার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের ক্যাম্প-৭-এ পাহাড়ধসে মো. একরাম (৭) নামে আরও এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু ঘটেছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা বলেন, 'আমরা খবর পাওয়া মাত্রই উদ্ধার অভিযানে নেমেছি। বিভাগীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও মাইকিং আগে থেকেই চলমান ছিল এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে।'
উখিয়াস্থ ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানান, অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিংসহ নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস। তবে স্বেচ্ছাসেবকদের অভিযোগ, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চাচ্ছেন না।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৬৭ মিলিমিটার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং আগামী কয়েকদিনও এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মনে রাখা হচ্ছে, ২০১৭ সালে বনাঞ্চল উজাড় করে তৈরি করা ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রায় ১২ লাখ বাসিন্দার মধ্যে অন্তত ১ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে তীব্র ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন