প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ফরিদপুর: এক হাতে চা-কফির ফ্লাস্ক, চোখে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, আর হৃদয়ে হালাল উপার্জনের দৃঢ় প্রত্যয়। প্রতিদিন জীবনের কঠিন বাস্তবতার কাছে হার না মেনে পথে নামেন হাবিবুল্লাহ নামে এক যুবক। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার বিভিন্ন বাজারে তাঁকে দেখা যায়।
কখনো বোয়ালমারী বাজারের হাসপাতালের গলি, কখনো চৌরাস্তা, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মাছ বাজার, থানা রোডের অলিগলিতে, এছাড়া কখনো দোকানের সামনে, আবার কখনো পথচারীদের কাছে গিয়ে বিক্রি করেন চা-কফি। তবে তাঁর আরেকটি পরিচয় হলো—তিনি একজন মসজিদের ইমাম। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসারের খরচ জোগাতে চা-কফি বিক্রি করে চলেছেন হাবিবুল্লাহ। তাঁর এই জীবনসংগ্রাম যেন বলে দেয়, কোনো সৎ কাজই ছোট নয়, পরিশ্রম কখনো অসম্মানের নয়।
বাগেরহাট থেকে আসা এই যুবক ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নে বসবাস করেন। স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করেন তিনি। কিন্তু ইমামতির সম্মানী দিয়ে পরিবারের সব খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সংসারের বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে অবসর সময়ে শেখর থেকে প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বোয়ালমারী পৌর সদরে চলে আসেন। এরপর পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন গরম চা ও কফি।
হাবিবুল্লাহর কাছে এই ফ্লাস্ক কেবল চা-কফি বিক্রির উপকরণ নয়; এটি তাঁর আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ ও পরিবারের জন্য নিরন্তর লড়াইয়ের প্রতীক। একদিকে মসজিদে ইমামতি করে মানুষকে ধর্মের পথে চলার আহ্বান জানান, অন্যদিকে নিজের জীবনেও সততা ও হালাল উপার্জনের আদর্শ ধারণ করে চলেছেন তিনি।
হাবিবুল্লাহ বলেন, “ইমামতির সম্মানী দিয়ে সংসারের সব খরচ চালানো কঠিন। পরিবারের দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে। তাই অবসর সময়ে চা-কফি বিক্রি করি। কোনো কাজই ছোট নয়, হালালভাবে উপার্জন করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করে পরিবার চালাতে চাই।”
নামাজের সময় হলে ব্যবসা গুটিয়ে ফিরে যান মসজিদে। ইমামতির দায়িত্ব পালনে যেমন অবহেলা করেন না, তেমনি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকেও পিছিয়ে থাকেন না। জীবনের এই দ্বিমুখী দায়িত্ব পালনে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা স্থানীয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা উজ্জ্বল সেখ বলেন, “হাবিবুল্লাহর জীবনসংগ্রাম আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। একজন মসজিদের ইমাম হয়েও সংসার চালানোর জন্য পথে পথে চা-কফি বিক্রি করতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই। তিনি কারও কাছে হাত না পেয়ে নিজের শ্রম দিয়ে উপার্জন করছেন। তাঁর এই সততা, আত্মসম্মান ও পরিশ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি মনে করি, তাঁর জীবন থেকে অনেকেই অনুপ্রেরণা নিতে পারেন।”
শাহ আলম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, “সংসারের দায়িত্ব পালনের জন্য হাবিবুল্লাহ যেভাবে পরিশ্রম করছেন, তা আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়। পেশার মর্যাদা শুধু কাজের পরিচয়ে নয়, কাজটি কতটা সৎভাবে করা হচ্ছে, তার মধ্যেও নিহিত। একজন ইমাম হয়েও তিনি পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন—এটি লজ্জার নয়, বরং সম্মানের। তাঁর মতো মানুষকে সহযোগিতা ও সম্মান জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব।”
হাবিবুল্লাহর গল্প কেবল একজন ইমামের চা-কফি বিক্রির গল্প নয়; এটি জীবনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। এটি শেখায়, দায়িত্ব এড়িয়ে নয়, বরং দায়িত্বকে আপন করে নিয়েই মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে। জীবিকার প্রয়োজনে কাজের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু সৎ পথে থাকার সংকল্প বদলাতে হয় না।
সমাজে অনেকেই হয়তো কাজের ধরন দেখে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করেন। কিন্তু হাবিবুল্লাহর জীবন মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সততা, শ্রম ও দায়িত্ববোধে। মসজিদে ইমামতি আর পথে পথে চা-কফি বিক্রি—দুটি কাজের মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন জীবনের সম্মানজনক পথ।
হাবিবুল্লাহর হাতে থাকা চা-কফির ফ্লাস্ক তাই শুধু জীবিকার পাত্র নয়, এটি আত্মনির্ভরতার প্রতীক। তাঁর জীবনসংগ্রাম আমাদের শেখায়—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, সৎ পথে পরিশ্রম করে পরিবারকে ভালো রাখার চেষ্টা কখনো ছোট হতে পারে না। বরং এই চেষ্টাই হয়ে উঠতে পারে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন