প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
জুলাই মাসে শহীদ ওয়াসিম আকরামের পেকুয়ার দক্ষিণ মেহেরনামার বাড়িতে আবারও দেখা দিয়েছে বন্যার পানি। বাড়ির দক্ষিণের উঠোন এবং ইটের রাস্তা তখনও হাঁটুসমান পানিতে ডুবে রয়েছে। বন্যার পানি বর্তমানে নামতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের আগস্টের ঘটনাক্রমে, তিন বছর পর ২০২৬ সালের একই পরিস্থিতিতে পুরো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এ বন্যা দেখলেই মা জোসনা বেগমের বুকের ভেতর জমে ওঠে দীর্ঘশ্বাস। কারণ, ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় চট্টগ্রাম শহর থেকে ছুটে এসেছিলেন ছেলে ওয়াসিম। গ্রামের রাস্তা পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে সাঁতার কেটেই বাড়ি পৌঁছাতে হয়েছিল। দোকান থেকে শুকনো খাবার কিনে তিনি পরিবারের খোঁজখবরও নিয়েছিলেন, এবং ঘরের নানা কাজও সামলেছিলেন।
কিন্তু তিন বছর পর আবারও একইভাবে বন্যার পানি উঠোন ছুঁয়েছে, অথচ এবার ওয়াসিম আর ফেরেননি। আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তাকে হারানোর দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংঘর্ষে ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ নিহত হন।
ওয়াসিমের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার মা জোসনা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলের স্মৃতিই এখন তার জীবনের অবলম্বন। ঘরের এক কোণে যত্ন করে সাজানো আছে ওয়াসিমের পাওয়া ক্রেস্ট, বিভিন্ন সম্মাননা, উপহার এবং ছবিগুলো। কথার ফাঁকে ফাঁকে তিনি সেগুলো স্পর্শ করেন, আর অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
জোসনা বেগম বলেন, ‘ছেলের কথা খুব বেশি মনে পড়ে। তিন বছর আগে এমন বন্যার সময় সাঁতার কেটে বাড়ি এসেছিল ওয়াসিম। আসার পথে বাজার থেকে খাবারও নিয়ে এসেছিল। এরপর বাড়িঘর গুছিয়ে নিতে অনেক পরিশ্রম করেছিল।’
কথার ফাঁকে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “কবরের পাশে গেলে আর ফিরে আসতে মন চায় না। মনে হয়, আমার ছেলেটা যেন এখানেই আছে। খুব কষ্ট লাগে।”
ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম সৌদি আরবে থাকাকালে ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে তাঁর যেন পৃথিবীটাই থমকে গিয়েছিল। তবে ভিসা জটিলতার কারণে সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি। এক মাস ১৭ দিন পর দেশে ফিরে প্রথমবারের মতো ছেলের কবরের সামনে দাঁড়ান। এরপর তিনি আর প্রবাসে ফেরেননি।
সম্প্রতি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের চৈরভাঙ্গা এলাকায় ইজারা নেওয়া তার মাছের ঘেরে কথা হয়। দিনের বেশিরভাগ সময় এখন সেখানেই কাটান। ঘের থেকে কিছুটা দূরেই ছেলের কবর রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে যান।
বারবার তার মনে ফিরে আসে ছেলের বলা একটি বাক্য, ‘শেষ বেলা, শেষবার।’ তখন তিনি বুঝতে পারেননি যে, সেটিই ছিল বিদায়ের ইঙ্গিত।
শফিউল আলম বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গিয়েছে, ছেলের মুখে ‘বাবা’ ডাক আর শুনতে পাই না। এই কষ্টটা বুকের ভেতর জমে আছে।’
তিনি জানান, একসময় তার স্বপ্ন ছিল ছেলে সরকারি চাকরি করবে। কিন্তু ওয়াসিমের পরিকল্পনা ছিল কানাডায় যাওয়ার। সে স্বপ্ন পূরণে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে জমি বন্ধক রেখে প্রায় ১৯ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল।
শফিউল আলম বলেন, ‘বড় ছেলে আর ওয়াসিমকে নিয়ে সংসারটা দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম। সবকিছু ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসছিল। কিন্তু ছেলের মৃত্যু আমাদের সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে।’
ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ৫ এপ্রিল ২২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
তবে মামলার অগ্রগতি নিয়ে খুব একটা খোঁজ রাখেন না শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘মামলার বাদী ওর মা। আমি শুধু চাই, দোষীদের শাস্তি হোক, আর নির্দোষরা যেন মুক্তি পায়। কেউ বিনা অপরাধে শাস্তি পেলে আমাদের সন্তানরা কবরে শান্তি পাবে না।’
মা জোসনা বেগমের কণ্ঠেও একই আকুতি, ‘দুই বছর হয়ে গিয়েছে। এখনো বিচার হল না। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।’
ওয়াসিমের ছোট বোন সাবরিনা ইয়াসমিন সোমা বলেন, ‘আমার ভাই দেশের গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছেন। আজ দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এখন আমাদের একটাই চাওয়া-আমার ভাইসহ যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের হত্যাকারীদের বিচার হোক। সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
ওয়াসিমের পরিবার জানায়, গত ১৩ জুন পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেহেরনামার মুরারপাড়ায় ওয়াসিমের কবর জেয়ারত পরবর্তী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাক্ষাৎকালে ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম ও মা জোসনা বেগমের হাতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র হস্তান্তর করেন।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তিন দফায় ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা এবং এনসিপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে পরিবারটি।
জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহ বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ওয়াসিমের কবর পাকা করা হয়েছে, নামফলক বসানো হয়েছে। ওয়াসিম স্মৃতি সংসদ গঠন করা হয়েছে। তাদের বাড়ির সড়ক সংস্কার করা হয়েছে।’
পেকুয়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের বাসিন্দা ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংঘর্ষে ২৪ বছর বয়সী তরুণ ওয়াসিম আকরাম নিহত হন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন