প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
একসময় ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় অথবা জমির আইলে গাব, বাতাবি লেবু, কদবেল, চালতা, রয়েল, ঢেউয়া, পিচফল, ডালিম, বরই, জাম, জামরুল, কাঠবাদাম, কামরাঙা, আতাসহ বিভিন্ন দেশীয় ফলের গাছ দেখা যেত। মৌসুম এলেই এসব গাছে ফল ধরত এবং পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে ফল ভাগ করে দেওয়া হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই চিত্র পরিবর্তিত হচ্ছে। দেশীয় ফলের গাছ কমে যাচ্ছে এবং পরিকল্পিতভাবে আমের বাগান বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সদর ইউনিয়নের সদরপুর, কৃষ্ণপুর, বিষ্ণুপুর, ভাষানচর, ঢেউখালী, আকোটেরচর, চরমানাইর, চরনাসিরপুর এবং নারিকেলবাড়িয়া সহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় বাড়ির আশপাশে প্রচুর দেশীয় ফলের গাছ ছিল। বর্তমানে অনেক বাড়িতে পুরোনো গাছ নেই। বসতবাড়ি সম্প্রসারণ, নতুন স্থাপনা নির্মাণ এবং জায়গার সংকটের কারণে অনেক পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সেইসাথে নতুন করে দেশীয় ফলের চারা লাগানোর প্রবণতাও কমে গেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বাড়ির জায়গা সংকুচিত হওয়া, কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন, পুরোনো গাছের বয়স, অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা এবং নতুন চারা না লাগানোর কারণে দেশীয় ফলের গাছের সংখ্যা কমছে। বিদেশি এবং বাণিজ্যিক ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই দ্রুত আর্থিক লাভের আশায় ফলের বাগান করার দিকে ঝুঁকছেন।
এতে একদিকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা দেশীয় ফলের গাছ কমছে, অন্যদিকে পরিকল্পিত বাণিজ্যিক ফলের বাগান বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফল চাষের পাশাপাশি দেশীয় ফলের গাছ টিকিয়ে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ এসব গাছ শুধু ফলের উৎস নয়, গ্রামীণ পরিবেশ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যেরও অংশ।
তবে দেশীয় ফলের গাছ কমলেও সদরপুরের বিভিন্ন এলাকায় আমের বাগান বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আম্রপালি এবং হাড়িভাঙা জাতের আমের চারা লাগাতে কৃষক এবং পরিবারগুলো আগ্রহী হচ্ছেন। কম জায়গায় বাগান করা যায়, বাজারে চাহিদা রয়েছে এবং ফল বিক্রি করে আয় করা সম্ভব হওয়ায় এ জাতের আমের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মৌসুমে সদরপুরের বিভিন্ন বাজারে বাতাবি লেবু, কদবেল এবং ডালিমসহ দেশীয় ফলের চাহিদা থাকলেও স্থানীয় সরবরাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এসব ফল বাইরে থেকে এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। আকার এবং মানভেদে একটি বাতাবি লেবু ৫০ থেকে ১০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
সদরপুর বাজারের ফল ক্রেতা মহসিন মিয়া বলেন, "আগে বাড়ির আশপাশেই বাতাবি লেবুসহ বিভিন্ন দেশীয় ফল পাওয়া যেত। এখন অনেক ফল বাজার থেকে কিনতে হয়। বাড়িতে আবার দেশীয় ফলের গাছ থাকা দরকার।"
আরেক ফল বিক্রেতা রুবেল হোসেন বলেন, "আগের তুলনায় অনেক দেশীয় ফল কম পাওয়া যায়। চাহিদা রয়েছে, কিন্তু স্থানীয় সরবরাহ কম।"
সদরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, "দেশীয় ফল পুষ্টির উৎস হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এসব ফলের গাছ সংরক্ষণে কৃষি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।" তিনি আরও বলেন, "আমের মতো লাভজনক ফলের বাগান কৃষকের আয় বাড়াতে পারে। তবে বাণিজ্যিক ফল চাষের পাশাপাশি বাতাবি লেবু, কদবেল, ঢেউয়া, ডালিমসহ অন্যান্য দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় এবং জমির আইলে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় ফলের চারা লাগানো হলে একদিকে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে এবং অন্যদিকে স্থানীয় বাজারেও এসব ফলের সরবরাহ বাড়বে। বাণিজ্যিক ফলের চাষের পাশাপাশি দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণ করা গেলে গ্রামীণ পরিবেশের ঐতিহ্যও টিকে থাকবে। আগামী প্রজন্মও তখন নিজেদের গ্রামের গাছ থেকেই ফিরে পেতে পারে দেশীয় ফলের সেই পরিচিত স্বাদ এবং সৌন্দর্য।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন