প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
শিয়ালের মাংস খাওয়ার ফলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, আবার জোঁকের তেল নাকি বাত-ব্যথা ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সারাতে সক্ষম। বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত এইসব লোকবিশ্বাসের পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিয়ালের মাংস বা তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এসব গুজব ও লোকবিশ্বাসের কারণে বন্যপ্রাণী নিধন এবং পাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিয়ালের মাংসে কি সত্যিই রোগ সারে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়ালকে অশুভ ও ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে দেখা হয় এবং এর মাংসের ঔষধি গুণ নিয়ে নানা বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কিছু মানুষ বিশ্বাস করে যে, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি, বাতসহ দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ ভালো হয়ে যায়।
সম্প্রতি বরিশালে সাতটি শিয়াল পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শিয়ালের মাংস খাওয়ার এই লোকবিশ্বাসের কথা সামনে এসেছে।
তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান মন্তব্য করেন যে, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি মূলত একটি ভ্রান্ত ধারণা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও জানান, শিয়ালের মাংস রোগ সারাতে সক্ষম এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আধুনিক ফার্মাকোলজিতেও এ ধরনের তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিয়ালকে ঘিরে প্রচলিত এসব ধারণা মূলত লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে উদ্ভূত।
তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার গুজব
বাংলাদেশে তক্ষককে ঘিরে বহু কোটি টাকার গল্প ও প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধি সারানো কিংবা যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি করার মতো কথিত গুণের কথা বলে তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে।
এমনকি কথিত ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কিন্তু তক্ষকের এসব কথিত ঔষধি গুণ বা কোটি টাকার বৈধ বাজারমূল্যের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এসব গুজবের কারণে তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে এবং পাচারের ঘটনা ঘটেছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, তক্ষককে ঘিরে একটি প্রতারণার চক্র গড়ে উঠেছে। আগে মানুষ বেশি তক্ষক ধরলেও বর্তমানে এ প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
জোঁকের তেল এবং লিচ থেরাপি এক নয়।
জোঁক দিয়ে চিকিৎসার ইতিহাস নতুন নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতিতে জীবন্ত জোঁক ব্যবহার করে চিকিৎসার কথা জানা যায়। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাতেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে মেডিকেল লিচ বা জোঁক ব্যবহারের চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, লিচ থেরাপি এবং বাজারে বিক্রি হওয়া তথাকথিত ‘জোঁকের তেল’ এক বিষয় নয়।
হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ বলেন, নির্দিষ্ট প্রজাতির ‘মেডিকেটেড’ জোঁক ব্যবহার করে কিছু ক্ষেত্রে লিচ থেরাপি দেওয়া হয়। তবে বাজারে প্রচলিত জোঁকের তেল বাত, ব্যথা বা যৌনসমস্যা সারানোর দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও বলেন, জোঁকের তেলের ঔষধি গুণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত লিচ থেরাপির ব্যবহার থাকলেও, সেটিকে জোঁকের তেল বিক্রির দাবির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, অজানা উৎসের প্রাণীর মাংস বা দেহজাত উপাদান খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণীর দেহে থাকা জীবাণু, পরজীবী বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
ফলে রোগ সারানোর আশায় এসব উপাদান ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
আইনেও নিষিদ্ধ শিয়াল ও তক্ষক শিকার
বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা), ২০২৬’ আইনে খেঁকশিয়াল, পাতিশিয়াল ও তক্ষককে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন ছাড়া কিংবা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট না থাকলে এসব প্রাণী শিকার, উত্যক্ত, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস জানান, শিয়াল ও তক্ষক নিয়ে দেশে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। তবে তক্ষকের কথিত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যেরও কোনো ভিত্তি নেই।
আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বন বিভাগ, পুলিশ, কাস্টমস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী বা আলামত জব্দ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
সংরক্ষণে বাড়ছে উদ্বেগ
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে খেঁকশিয়ালকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এবং তক্ষককে ‘লিস্ট কনসার্ন’ বা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
২০২৬ সালের মূল্যায়নেও তক্ষক ‘লিস্ট কনসার্ন’ অবস্থানে রয়েছে। তবে আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলমের মতে, বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো তক্ষককে বাণিজ্যিকভাবে প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, একটি প্রাণী আন্তর্জাতিকভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে না থাকলেও স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত শিকার ও বাণিজ্যের কারণে তার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, শিয়ালের মাংস, তক্ষক বা জোঁকের তেলকে ঘিরে প্রচলিত অধিকাংশ রোগ নিরাময়ের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এসব লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। একই সঙ্গে কুসংস্কারের কারণে বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করাও জরুরি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন