প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
টানা বৃষ্টির ফলে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি বর্তমানে ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। বৃষ্টির অব্যাহত থাকার কারণে বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষজনের ভোগান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে বন্যা এবং পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় কক্সবাজারে মৃত্যুর সংখ্যা মোট ২৮ জনে পৌঁছেছে, যা প্রশাসন কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান এই মৃত্যু সংখ্যার তথ্য নিশ্চিত করেন।
স্থানীয় জনগণের মধ্যে জানা যায়, শনিবার (১১ জুলাই) দিনে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমছিল। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় বন্যার পানিও কিছুটা নেমে গিয়েছিল। কিন্তু রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত আবারও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এই কারণে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। দুর্গত মানুষগুলো খাবার এবং পানীয় জলের সংকটে ভুগছেন। একই সঙ্গে পাহাড়ধসে ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিংসহ বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণে এগিয়ে এসেছে। তবে চাহিদার তুলনায় এসব ত্রাণ অপ্রতুল বলে দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।
রোববার (১২ জুলাই) চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার সদর এবং উখিয়ার দুর্গতদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণের সময় তিনি বলেন, বন্যার্তদের ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় মানবিক সহায়তার পরিমাণ অপর্যাপ্ত, সরকারি সহযোগিতা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
কক্সবাজার সদর আসনের এমপি লুৎফুর রহমান কাজল রামু, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদর এলাকায় বন্যা দুর্গতদের জন্য ত্রাণ বিতরণ করেছেন এবং পাহাড় ধসে নিহতদের পরিবারের জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। এই ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে জেলা ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ দুর্গতদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্য প্রদান করছেন। পেকুয়াতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে ছফুয়ানুল করিমের নেতৃত্বে দিনে এবং রাতে শুকনো খাবার, পানিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, ভারি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে জেলায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে এক নারী এবং পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী এক শিশু রয়েছে। এই ঘটনায় কক্সবাজারে চলমান দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে।
পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, শনিবার রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী মুশফিকুর রহিম নামে এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। ওই শিশুর পরিবার জানায়, ওই সময় শিশুটিকে ঘরে রেখে বাইরে কাজ করছিলেন তার মা। পরে শিশুটি পানিতে পড়ে যায় এবং স্রোতে ভেসে যায়। তার খোঁজার পর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে প্রায় দেড়শ ফুট দূরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেও অনেক এলাকায় এখনো পানি রয়েছে। তাই সকলের অপেক্ষা করা উচিত সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে।
অন্যদিকে, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউপির পূর্ব কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে রোজিনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। তিনি ওই এলাকার আব্দুল মজিদের স্ত্রী।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন জানান, রাতের খাবারের প্রস্তুতির সময় পাহাড়ঘেঁষা রান্নাঘরে অবস্থান করছিলেন রোজিনা বেগম। এসময় হঠাৎ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে এবং ঘরসহ তিনি মাটিচাপা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট উদ্ধার অভিযান চালিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এসময় তার স্বামী আব্দুল মজিদ সন্তানসহ দোকানে উপস্থিত ছিলেন।
আব্দুল মজিদ বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি স্ত্রীকে বারবার রান্নাঘরে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু রাতের খাবার প্রস্তুত করার দুর্ভাগ্যের কারণে এই মারাত্মক ঘটনায় আক্রান্ত হন।
কক্সবাজার সদরের ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেন, টানা বর্ষণে জেলার ক্ষতবিক্ষত পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হলেও অনেকেই পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে ফিরে আসছেন। টানা বর্ষণের সময় পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ঝুঁকি দেখলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়াই শ্রেষ্ঠ উপায়। মাইকিংসহ ফোর্সের প্রয়োগ করা হলেও বাড়ি ছাড়তে না চাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার ঘটনার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের ঢাল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করা উচিত নয়।
ইউএনও আরও জানান, গত ৭ জুলাই বিকেলে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নম্বরওয়ার্ডের দরিয়ানগর বড়ছড়া হাজীঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে লিমা আক্তার (২৫) মারা যান। এসময় তার স্বামী জসিম উদ্দিনও আহত হন। বৃষ্টির মাঝেও মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কিছুক্ষণ যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়। বৃষ্টি দুর্যোগকালীন সময়ে সবাইকে নিরাপদে থাকার আবেদন করেছেন ইউএনও।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আগামী কয়েকদিন মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। অতিভারি বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজনকে সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, জেলার দুর্গত উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে চলেছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সবসময় প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। সকলকে প্রশাসনের নির্দেশনা পালন করতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্য অনুরোধ জানান ডিসি। কক্সবাজার জেলায় সপ্তাহজুড়ে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে মোট ২৮ জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে ১৭ জন ছিলেন রোহিঙ্গা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন