প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বরিশাল সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন বিএনপি অনুসারী শিক্ষক হাওলাদার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। তবে ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মব সৃষ্টি করে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন ওই কলেজের সহকারী অধ্যাপক মহানগর খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন এবং জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার। খেলাফত মজলিসের নেতা মোয়াজ্জেম হোসেনকে তখন বলা হয়েছিল, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হবে। কিন্তু শাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগ করানোর পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও মহানগর কর্মপরিষদ সুরার সদস্য মো. হাবিবুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সময়ে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারি চাখার কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ জামায়াতে ইসলামের রুকন অধ্যাপক মো. আব্দুর রবকে। এর ফলে পুরো কলেজটিই জামায়াত নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। খেলাফত মজলিসের নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন এসব ঘটনার প্রতিবাদ করেন।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার নিশ্চয়তা দিয়ে তাঁকে দমিয়ে রাখা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জামায়াত নেতা হাবিবুর রহমান অবসরে যান। অভিযোগ উঠেছে, তখন চারজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে টপকিয়ে আগের মতো মব সৃষ্টি করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার। এ অবস্থায় খেলাফত মজলিসের নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আদালতে মামলা দায়ের করলে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রব এবং অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এর পর থেকে পুরো কলেজ জামায়াতে ইসলামের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। খেলাফত মজলিস বরিশাল মহানগর শাখার সহসভাপতি এবং সিটি কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, ‘সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর কয়েক নেতার নেতৃত্বে মবের শিকার হন। তখন তিনি জামায়াতের নেতাদের কাছে দায়িত্ব দিয়ে পুরো কলেজ নিয়ন্ত্রণের জন্য আব্দুল জব্বারের নেতৃত্বে মব সৃষ্টি করা হয়। পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় জামায়াত নেতা হাবিবুর রহমানকে। হাবিবুর রহমান অবসরে চলে গেলে রত্নীতির ভিত্তিতে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল আমার। কিন্তু কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জামায়াত নেতা আব্দুর রব অফিস আদেশের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়ে যান আব্দুল জব্বার। আমি এর প্রতিবাদে আদালতে মামলা দায়ের করি। আদালত সূত্রে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কার্যক্রম স্থগিত রাখার আদেশ প্রদান করা হয়। এরপরও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রব এবং অধ্যক্ষ আবদুল জব্বার আমাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এরপর আমাকে শর্ত দেওয়া হয় মামলা তুলে নেওয়ার। গত ৬ তারিখ আমি মামলা তুলে নিলে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।’ মোয়াজ্জেম দাবি করেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আব্দুল জব্বার ছিলেন চতুর্থ।
কিন্তু মব সৃষ্টি করে তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়ে গেছেন। মোয়াজ্জেম বলেছিলেন, ‘মামলা তুলে নেওয়া ছাড়া আমার কিছু করার উপায় ছিল না। কারণ পুরো কলেজ এখন জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন রবিবার দুপুরে বলেন, ‘২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দিনটি আমার চোখে এক কালো অধ্যায়ের মতো। যদিও এর আগে দীর্ঘদিন ধরে আমাকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে। তবে ওই ২১ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে কলেজের সহকারী অধ্যাপক মহানগর খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন এবং জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল জব্বার কিছু শিক্ষককে নিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করে পদত্যাগপত্র লেখার জন্য কাগজ নিয়ে আসে। তাতে লেখা ছিল আমি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমি তাতে স্বাক্ষর দিতে রাজি হইনি। পরে আমার ওপর নির্যাতন চালিয়ে স্বাক্ষর নেয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলাম। তবে ওই সময় কলেজের পরিবেশ ভীষণ ভয়াবহ ছিল।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল সিটি কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী, কলেজে বর্তমানে ৩৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং অন্য দুজন প্রভাষক ছাড়া জামায়াতের অনুসারী অন্য কোনো শিক্ষক নেই। তবে কর্মরত সব শিক্ষক-কর্মচারীদের তাঁরা ভীতিকর অবস্থায় রাখেন। তাঁদের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে মব সৃষ্টি করেন। যেমনটি দুবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং সভাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। এই শিক্ষকদের মতে, এবারে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে প্রথম নাম ছিল ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের। কারণ তিনি বর্তমানে কলেজের সবার জ্যেষ্ঠ। পরে রয়েছেন দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ারা বেগম। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তৃতীয় ছিলেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আফরোজা বেগম। ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল জব্বার ছিলেন চতুর্থ অবস্থানে।
কিন্তু কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জামায়াত নেতা আব্দুর রব অফিস আদেশে আব্দুল জব্বারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। আর এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় মোয়াজ্জেম হোসেনকে বরখাস্ত করা হয়। তবে কেউই প্রতিবাদ করতে পারেননি। এখন জামায়াতের এই নেতাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও কেউ করতে পারছেন না। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বর রবিবার দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে আলাপকালে বলেন, ‘আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি দায়িত্ব পালন করছি। এখানে মবের কোনো বিষয়ে নেই। আর মোয়াজ্জেম হোসেন জ্যেষ্ঠ হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে।’ সাবেক অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যাঁরা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন কেবল তাঁরাই বলতে পারবেন।’ তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রবের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর সেলফোন নম্বরে বারবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন