প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ : বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণের টিউশনির সঞ্চিত সামান্য টাকায় ফুটপাতের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বর্ণমালা শেখানোর মাধ্যমে ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল একটি নীরব মানবিক বিপ্লবের। ১৪ বছর পর তা আজ রূপান্তরিত হয়েছে এক সুবিশাল আশার বাতিঘরে। ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশন’ নামের সেই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি আজ কেবল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিঃস্ব, আশ্রয়হীন ও প্রবীণদেরই ভরসাস্থল নয়; বরং সীমানা পেরিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা, নেপাল ও সুদানের যুদ্ধ ও দুর্যোগকবলিত বিপন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশের ভালোবাসা ও মানবিকতার স্পর্শ।
বাংলাদেশ এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (যৌথ স্টক) নিবন্ধিত এই অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংস্থাটি কেবল জরুরি ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না। বরং শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাবলম্বিতা, স্বাস্থ্যসেবা ও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার মাধ্যমে এক টেকসই সামাজিক রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে।
মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন ও লক্ষ্য তুলে ধরে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমরা বিশ্বাস করি, একজন মানুষকে সাময়িকভাবে সাহায্য করার পাশাপাশি তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষ যখন মানবিক সংকটে পড়ে, তখন সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
তিনি জানান, মাস্তুল ফাউন্ডেশন তার অগ্রযাত্রার ১৫ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবদান, নিজস্ব সেবামূলক প্রকল্পসমূহ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক সংঘাত ও দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যমতে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ ও চরম অবরোধের প্রেক্ষাপটে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাজায় জরুরি ভিত্তিতে সুপেয় পানি, শুকনো ও রান্না করা পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানোর পাশাপাশি আহত শিশু ও রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
একইভাবে নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত দুর্গতদের মাঝে জরুরি খাদ্য সামগ্রী ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণের পাশাপাশি ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে নগদ অর্থ ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। এছাড়া সুদান সংকট ও গৃহযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট তীব্র দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুচ্যুত পরিবার ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মাঝে জরুরি খাদ্য সহায়তা পার্সেল বিতরণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি।
বৈশ্বিক অঙ্গনে এই মানবিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে কাজী রিয়াজ রহমান বাসস’কে বলেন, ‘যুদ্ধ ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা। গাজা থেকে শুরু করে সুদান কিংবা নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়া মানুষের করুণ চিত্র আমাদের ব্যথিত করে। দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতাকে পাথেয় করে আমরা বিশ্বের যেখানেই বিপন্ন মানুষ পাই, সেখানেই মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
টেকসই স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি ও মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে সরকারের সহযোগী হিসেবে মাস্তুল ফাউন্ডেশন কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, জাকাত ও সাদকার শরিয়াহসম্মত ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মক্ষম মানুষকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। অসচ্ছল পরিবারগুলোর হাতে সেলাই মেশিন, উন্নত জাতের গাভী, ছাগল, হাঁস-মুরগি, রিকশা-ভ্যান এবং বীজ ও সার তুলে দিয়ে উপার্জনের স্থায়ী পথ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে বেকার তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে আইটি প্রশিক্ষণ, মোটর ড্রাইভিং ও কারিগরি শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করা হচ্ছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে মাস্তুল প্রধান বলেন, ‘মাস্তুলের লক্ষ্য হলো সহায়তা পাওয়া একজন মানুষ যেন ভবিষ্যতে নিজের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি আরও অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্য হয়ে ওঠে। মানুষের দেওয়া জাকাত, সাদকা ও দানের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই— যা জীবন পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে।’
১৫ স্থানে ‘মেহমানখানা’ ও বিনামূল্যে খাবার
সংস্থাটি জানায়, দেশে একটি ক্ষুধামুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের নিয়মিত উদ্যোগ ‘মেহমানখানা’র মাধ্যমে রাজধানীর ১৫টি নির্ধারিত জনবহুল পয়েন্টে প্রতিদিন হাজারো অসহায়, পথচারী, দিনমজুর ও প্রবীণদের মাঝে বিনামূল্যে মানসম্মত রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে কোনো করুণা নয়, বরং গ্রহীতার আত্মমর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয় ফাউন্ডেশন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ
মাস্তুল ফাউন্ডেশন জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সংস্থাটি দেশব্যাপী ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক ও উপকূলীয় অঞ্চল, উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এতিমখানা এবং মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক লাখ ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ ও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
আশ্রয়হীনদের জন্য প্রবীণ নিবাস ও শেষ বিদায়ের মর্যাদা
সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজধানীর হাজারীবাগের বারইখালিতে নিজস্ব ভবনে এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আবাসিক মাদ্রাসা, স্কুল ও এতিমখানা পরিচালনা করছে মাস্তুল।
এছাড়া নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জন্য একটি ১০ তলা বিশিষ্ট ‘ইসলামিক শেল্টারহোম কমপ্লেক্স’ নির্মাণাধীন রয়েছে—যেখানে আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে।
এর পাশাপাশি আর্সেনিকপ্রবণ ও সামুদ্রিক উপকূলীয় দুর্গম এলাকায় গভীর নলকূপ ও ওয়াটার ফিল্টারিং প্ল্যান্ট স্থাপন করে সুপেয় পানির সংস্থান করা হয়েছে। একইসাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদনে বেওয়ারিশ ও পরিচয়হীন মরদেহের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী গোসল, জানাজা ও দাফনকাজ পরিচালনা করছে সংস্থাটি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি আধুনিক গোসলখানা স্থাপনের উদ্যোগও এতে রয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
জানা যায়, মাস্তুল ফাউন্ডেশন তাদের সেবা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতে সরকারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে যুক্ত করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠাতা কাজী রিয়াজ রহমানের নেতৃত্বে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সাবেক সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ, ডিরেক্টর হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) কাজী ইফতেখার-উল-আলম এবং চিফ পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মানের অডিট ফার্মের মাধ্যমে আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা এবং শরিয়াহ বোর্ডের তদারকিতে জাকাত তহবিল পরিচালিত হয়।
কাজী রিয়াজ রহমান বলেন, ‘একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষার সুযোগ, একটি দরিদ্র পরিবারের স্থায়ী উপার্জন, একজন প্রবীণের নিরাপদ আশ্রয় কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি পরিবারের মুখে খাবার পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল অঙ্গীকার। নতুন এই অধ্যায়ে দেশের মানুষের সহযোগিতাকে শক্তি করে বাংলাদেশে মানবিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বিপন্ন মানুষের পাশে আমরা থাকতে চাই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন