প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেও, লাখো মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। ঘরে খাবার নেই এবং উনুনেও আগুন জ্বলছে না। আসলে ঘরে ঘরে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই চলছে। বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ ও মাছের ঘের ভেসে গেছে। বানভাসি মানুষের জন্য বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার কথা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের শাকের মোহাম্মদচর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছাইন রয়েছেন। তার বসতঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি ঢোকার পর থেকেই রান্নার চুলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গত চার দিন ধরে তার উনুনে আগুন জ্বলেনি। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে তার মতো অনেক বানভাসি পরিবারের অনাহারে ও অর্ধাহারে দিন কাটছে।
মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, ‘এখানে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। কিছুই খেতে পারছি না। চারদিকে এত পানি যে এখনো চুলায় আগুন জ্বালিয়ে রান্না করাও সম্ভব হচ্ছে না। সবাই অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, আর অনেকের ঘরবাড়িও ভেঙে গেছে ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মতোই পেকুয়া, মাতামুহুরি, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ জনপদ এখনও পানির নিচে। হাজারো ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। পানিবন্দি মানুষ এখন দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াই চলছে।
কাকারা এলাকার বাসিন্দা আব্দু রশিদ বলেন, ‘আমরা প্রতিবছরই এই জলাবদ্ধতার কারণে চরম দুর্ভোগের শিকার হই। আমাদের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়, আর আমরা উঁচু মাচার ওপর আশ্রয় নিয়ে থাকতে বাধ্য হই। প্রতিনিয়ত আমাদের অনেক কষ্ট হয়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ওঠানামা করতে হচ্ছে। এত কষ্টের মধ্যেও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকে না। প্রতিটি দিন আমাদের জন্য এক কঠিন সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ায়।’
রফিক উদ্দিন বলেন, ‘এই গ্রামে অন্তত ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষের বসবাস। বর্তমানে গ্রামের সবাই পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। শুধু মানুষ নয়, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ সবকিছু নিয়েই আমরা চরম বিপাকে পড়েছি। কোথায় নিয়ে নিরাপদে রাখব, সেটাও বুঝতে পারছি না। চারদিকে পানি, তাই আমরা সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছি।’
ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত শুকনো খাবার। কারণ প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং রান্নাবান্না করার কোনো সুযোগ নেই। তাই জরুরি ভিত্তিতে তাদের কাছে খাবার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।’
ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘চকরিয়া উপজেলাকে অবিলম্বে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা উচিত। একই সঙ্গে সরকারের সব পর্যায় থেকে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণসহায়তা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শুকনো খাবার, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো উচিত। কাকারা, লক্ষ্যারচর, কুয়ারবিলসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ইউনিয়নে সরকারের বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও দেশের অন্যান্য বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মতোই ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে আছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের পরিস্থিতি সেভাবে সবার নজরে আসছে না। তাই আমি মনে করি, পুরো বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, তাদের এই বন্যার পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের দুর্ভোগ সবার সামনে তুলে ধরতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’
কক্সবাজারে জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৯২৪ মিলিমিটার। অথচ গত এক সপ্তাহেই ঝরেছে ৭০০ মিলিমিটার বৃষ্টি। অতিবর্ষণের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তবে নদী দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সময়মতো স্লুইসগেট খুলে না দেয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে বলে দাবি বানভাসি মানুষের।
এদিকে সব স্লুইসগেট খুলে দেয়া হয়েছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসক। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘বিগত বছরের গড় বৃষ্টিপাতের রেকর্ড অনুযায়ী, জুলাই মাসে কক্সবাজারে গড়ে ৯২৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত সাত দিনেই জেলায় প্রায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো জুলাই মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা, তার প্রায় ৮০ শতাংশই মাত্র সাত দিনের মধ্যে হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও জানান, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি বান্দরবানে ভারী বৃষ্টির কারণে মাতামুহুরী নদী দিয়ে নেমে আসা পানির ঢল চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী ও রামু এলাকাকে প্লাবিত করেছে। কক্সবাজার জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৬৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গতকাল থেকে বৃষ্টিপাত অনেকটাই কমে এসেছে এবং পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ৩০ লাখ টাকা এবং ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, পাহাড়ধসে কক্সবাজার জেলায় মোট ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৩ জন, কক্সবাজার সদরে ২ জন এবং চকরিয়ায় ২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও পানিতে ডুবে চার শিশুর মৃত্যু এবং মাটির দেয়াল ধসে আরও দুইজন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে জেলায় মোট ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় কক্সবাজার জেলায় ৪৬০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ২২টি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ অবস্থান করছে। সেখানে শুকনো খাবার, যেমন চিড়া, গুড়, বিস্কুটসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ও বিশেষ চাহিদার বিষয়েও আলাদা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মো. আ. মান্নান আরও বলেন, ‘প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় একযোগে কাজ করছে। স্লুইস গেট নিয়ে যে বিভ্রান্তি রয়েছে, তা সঠিক নয়। গত দুই দিন ধরে সব স্লুইস গেট খোলা রয়েছে। শুধু জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সাময়িকভাবে গেট বন্ধ করা হয়। ভাটার সময় আবার সেগুলো খুলে দেয়া হয়। বর্তমানে কোথাও কোনো স্লুইস গেট বন্ধ নেই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন