প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
এই জেলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির সীমানায় পৌঁছে গেছে। কিছু পরিবার এখনও তাদের পূর্বপুরুষের পেশা রক্ষা করতে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন।
বাঁশ শিল্পের কারিগরদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে এই শিল্প এখন হুমকির সম্মুখীন। তাই দেশের উত্তর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি। তারা আবেদন জানিয়েছেন যে বাঁশ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি ও হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন কারিগর এই পেশা ধরে রেখেছেন। তবে বাঁশজাত দ্রব্যের চাহিদা হ্রাস পাওয়া, কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়া এবং শ্রমের সঠিক মূল্য না পাওয়ার কারণে অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে এক সময় বাঁশের তৈরি শিল্পপণ্যের ব্যবসা ছিল খুবই সফল। প্রতিটি পরিবারের হাতে কুলা, ডালি, ঝুড়ি, মোড়া, খেলনা, মাছ ধরার ডার্কি, খলইসহ নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীর উৎপাদন করা হতো। গ্রামীণ হাটবাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও, প্লাস্টিকের সস্তা এবং টেকসই বিকল্পের কারণে বাঁশের তৈরি পণ্যের বাজার হ্রাস পেয়েছে।
সপ্তাহিক বা দৈনিক বাজারগুলোতে বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বেচাকেনা হলেও, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মতে, দিন দিন এসব সামগ্রীর বিক্রি কমতে চলেছে।
বোচাগঞ্জ হাটে বাঁশের তৈরি পণ্যের কারিগররা জানান, বাঁশের পণ্য তৈরিতে সময় ও শ্রমের তুলনায় তারা এখন ন্যায্য মূল্য পেতে পারছেন না। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে, উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এক সময় স্থানীয় বাঁশ সহজে পাওয়া যেত, এখন বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে বেশি দামে বাঁশ কিনতে হচ্ছে।
চল্লিশ বছর ধরে বাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত অভিজ্ঞ কারিগর সুবাশ পাল বাসসের সঙ্গে আলাপকালে জানান, আগে বাঁশের কাজ করে সংসার ভালো চলত, এখন আর ভালো চলে না। ছেলে-মেয়েরা এই কাজ শিখতে আগ্রহী নয়। সবাই অন্য কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছে। অনেক কারিগর এখন দিনমজুর বা ইজিবাইক চালাচ্ছেন।
কারিগর অধীরচন্দ্র রায় বলেন, বাঁশের দাম এখন অনেক বেড়ে গেছে। তৈরি করা পণ্যের বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে। লাভ কম-বেশি যাই হোক, বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষদের এই পেশা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা ছোট থেকে এই বাঁশের জিনিস তৈরির কাজ শিখেছি। বাবা-দাদাদের কাজ করা দেখেই এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কুলা, ডালি, হাঁস ঢাকা চালা, পাখা তৈরি করি। ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, 'হয়তো এক সময় আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই পেশা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।' আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে যাবে। তখন হয়তো এই পেশায় আর কোনো কারিগর পাওয়া যাবে না!'
কারিগর কান্তিলাল রায় বলেন, 'আমার বাপ-দাদারা এই ব্যবসা করেছেন, এখন আমিও এটি করছি। দাম বেড়ে গেছে, শ্রম ও হাজিরা মূল্যও বেড়ে গেছে। আমরা সপরিবারে বাঁশ শিল্পের কাজ করি। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। শুধুমাত্র ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এই কাজ করছি।'
কারিগর সুরেশ বর্মন জানান, আমার তিন সন্তান। বড় ছেলেকে অন্য পেশায় দিয়েছি। কারণ এই ব্যবসা দিয়ে সংসার চলে না। ছোট ছেলে বাঁশ শিল্পের কাজে আমার সাথে থাকে। মেয়ে লেখাপড়া করছে। আমি সেতাবগঞ্জ, কাহারোল, ধুকুরঝাড়ি, দিনাজপুর, মঙ্গলপুর হাটে বাঁশের তৈরি পণ্য নিয়ে ব্যবসা করি।
কারিগর জামাল উদ্দিন কুলা, ঢাকি, পাখা, চালনসহ বিভিন্ন বাঁশের পণ্য তৈরি করে বিক্রি করছেন। তিনি জানান, ডালির দাম সাইজ অনুযায়ী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, অন্য সব বাঁশের তৈরি পণ্যের দাম একই রকম।
তিনি বলেন, 'আধুনিকতার ছোঁয়ায় তৈরি বাঁশের পণ্য রং দিয়ে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে, ভালো দামে বিক্রি করা যায়। এজন্য আমি বাঁশের পণ্য ওই আঙ্গিকে তৈরি করে বাজারজাত করতে শুরু করেছি। এতে আমার ভালো লাভ হচ্ছে।'
তরুণ উদ্যোক্তা সোহাগ হোসেন বলেন, বাঁশ শিল্প শুধুমাত্র অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ। শিল্পটি বিলুপ্ত হলে আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। এটি রক্ষা করতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা, আধুনিক এবং মানসম্মত বাঁশ শিল্পের প্রসার ও বাজারজাতকরণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তবেই এই শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
কারিগরদের মতে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরিতে বিসিক কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানসম্মত পণ্য তৈরি ও বাজারজাত নিশ্চিত করা হলে কারিগররাও উৎসাহিত হবে। এছাড়াও, এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল বাঁশের বাণিজ্যিক উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহ প্রদান এবং সহজ ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বাঙালির ঐতিহ্য বাঁশ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
তারা জানান, এই শিল্পের কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ আবশ্যক। অন্যথায় দিনাজপুরে বাঁশ শিল্পের ইতিহাস বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বিসিক দিনাজপুরের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। বাঁশের কারিগরদের জন্য কমপক্ষে তিন মাস মেয়াদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ঋণ নিতে ইচ্ছুক কারিগরদের জন্যও ব্যবস্থা আছে। শিল্পটির তদারকি ও সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে। যা মানসম্মত এবং টেকসই পদ্ধতিতে বাঁশের পণ্য তৈরি ও বাজারজাতকরণের জন্য সহায়ক হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন