প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে মাইকে ট্রেন থামার বার্তা শোনা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। মো. সোহরাব হোসেন সুজন স্টেশনমাস্টারের কক্ষে বসে ট্রেনের সিগন্যাল ও কন্ট্রোল রুমের নির্দেশনা তদারকি করছেন। সাধারণ মানুষের মতো কক্ষ থেকে বের হলেও বোঝা যায় না যে তিনি বাঁ পা ছাড়া এত বড় স্টেশনের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
২০০৩ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মাগুরা গ্রামের কিশোর সুজন সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিলেন। এক দুপুরে বড় বাবার সঙ্গে মাঠে গিয়ে পাওয়ার টিলার চালানোর ইচ্ছা জাগে তার। ওই সময় বাড়িতে চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের বৌভাতের আয়োজন চলছিল, চারপাশে উৎসবের আমেজ ছিল। ছেলের আবদারে শেষমেশ বড় আব্বা তাকে গাড়িটি চালাতে দেন। কিন্তু অনভিজ্ঞতার কারণে মোড় ঘোরাতে গিয়ে পাওয়ার টিলারটি পাশের পুকুরে উল্টে যায়। এতে সুজনের বাঁ পা স্লিপ কেটে টিলারের ফালসেটে ঢুকে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে দিনাজপুর এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। জীবন বাঁচাতে হাঁটুর নিচ থেকে সুজনের বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়।
সেই সময় এক বছর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধুদের সামনে কিভাবে দাঁড়াবেন, এ নিয়ে কিশোর মনে সংকোচ ও লজ্জা ভর করে। গ্রামের মানুষ বলতে শুরু করে, ‘ছেলেটার জীবন তো শেষ, ওকে দিয়ে আর কিছু হবে না।’ কিন্তু সুজনের উকিল বোন নাসিমা ও দুলাভাই হাবিবের সহায়তায় পায়ে প্লাস্টিক সার্জারি করে কৃত্রিম পা লাগানো হয়। লজ্জা ভেঙে কৃত্রিম পা দিয়ে সাইকেল চালানো শুরু করেন এবং স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। তবে ক্লাসে যেতেন না, শুধু পরীক্ষা দিতেন। স্কুলের গণিত শিক্ষক মহিনুদ্দীন স্যারের সহযোগিতায় বাড়িতে বসেই পড়াশোনা চলতে থাকে। স্থানীয় কোচিংয়ের মডেল টেস্টে প্রথম স্থান অধিকার করে সবাইকে চমকে দেন। ২০০৮ সালে এসএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে তিনি জিপিএ ৪.৬০ পান। এরপর কলেজ থেকে এইচএসসিতে ৪.৯০ অর্জন করেন।
সুজনের স্বপ্ন ছিল আরও বড়। ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে চান্স পান। রাজশাহী থেকে মাস্টার্স শেষ করার পর সুজন দিনাজপুরে ফিরে আসেন। কোনো কোচিং সেন্টারে না গিয়ে মেসে বসে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি শুরু করেন। রাত ৩টা-৪টা, কখনো ফজরের আজান পর্যন্ত টেবিল-চেয়ারেই কাটত তার সময়।
সুজনের কঠোর পরিশ্রমের ফল মিলতে দেরি হয়নি। তিনি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ একাধিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে ২০১৯ সালের মে মাসে সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম) হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগ দেন।
দিনরাত সুজনের দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দেখে কর্তৃপক্ষ মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের মাথায় ব্যস্ত পীরগঞ্জ স্টেশনের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত করে। চার বছর পর ২০২৩ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ স্টেশনমাস্টার হিসেবে একই স্টেশনের দায়িত্ব নেন। বর্তমানে সুজন সময়মতো ট্রেনস্টেশন পরিচালনা, শত শত যাত্রীর নিরাপত্তা এবং টিকিট ও ক্যাশের সঠিক হিসাব সবকিছুই দক্ষতার সঙ্গে সামলাচ্ছেন।
সুজন বলেন, "প্রতিদিন আমার মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে রেলস্টেশনে আসা-যাওয়া করি। এখন স্যাররা আমার প্রতি ভরসা করে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি।"
স্টেশনমাস্টার সুজন আরও বলেন, "সমাজে কে কী বলল, তাতে কান দিলে চলা যায় না। লক্ষ্য যদি স্থির থাকে আর মনে আত্মবিশ্বাস থাকে, তবে কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন