প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশের পথে ফিরিয়ে পাঠানোর বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে দুবাই পুলিশ। তবে, তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাঁকে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়ে চারটি বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়ে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দুবাই পুলিশের পক্ষ থেকে এটি একজন ইতিবাচক অগ্রগতির একটি রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দুবাই পুলিশ মূলত প্রত্যর্পণের আইনি এবং কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাচ্ছে।
দুবাই পুলিশের চিঠিটি পাঁচ দিন আগে বাংলাদেশে পৌঁছেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সেই সূত্রগুলো জানায় যে, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখার সহযোগিতায় ওই চিঠির জবাব তৈরির কাজ করছেন দুদকের কর্মকর্তাগণ।
বেনজীর আহমেদের মামলার তদন্ত এবং প্রত্যর্পণের নথিপত্রের বিষয়টি সমন্বয় করছেন দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘দুবাই পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, দ্রুত জবাব পাঠানো যাবে এবং তাঁকে (বেনজীর) দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হব।’
বেনজীর আহমেদের দুটি ম্যাসেল দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া তথ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৪ জুন প্রথম জাতীয় সংসদে জানান। তিনি বলেন, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার তার আটক নিশ্চিত হওয়ার পর, আন্তর্জাতিক পুলিশের সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণ চায়। দুদক প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে এবং কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠায়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য এবং প্রত্যর্পণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস পর সেই আবেদনের জবাব দেয় দুবাই পুলিশ। মোটামুটি বেনজীর এখন দুবাইয়ের কারাগারে আটক আছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দুবাই পুলিশের চিঠিতে মূলত চারটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ কোন আইনের আওতায় এবং কী প্রক্রিয়ায় বেনজীর আহমেদকে ফেরত নিতে চায়। কারণ, বাংলাদেশ এবং ইউএইর মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই। এ ছাড়া আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি কী, সেই পরোয়ানার কার্যকারিতা কতটুকু এবং সমগ্র প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে কেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয় করছে—এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যাখ্যা এবং নথিপত্র প্রস্তুত করে খুব দ্রুত জবাব পাঠানো হবে বলেও জানা গেছে। ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে, দুবাই পুলিশের চিঠির ভাষা থেকে এটি স্পষ্ট যে, তাঁরা বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং পরবর্তীতে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৪ সালে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। এরপর আদালতের আদেশে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের বিপুল সম্পদ জব্দ করা হয়। তদন্ত চলাকালে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে দেশ ছেড়ে যান।
পরবর্তীতে বেনজীরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেনজীর আহমেদ-এর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং জালিয়াতিসহ একাধিক মামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলমান।
দেশ ছাড়ার পর থেকে বেনজীর আহমেদ-এর অবস্থান সম্পর্কে দীর্ঘ সময় নিশ্চিত কোনো তথ্য ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছেও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল না।
বেনজীরকে গ্রেফতারের বিষয়ে একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের পেছনে তাঁর কয়েকজন সাবেক সহযোগীর তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যবসায়িক এবং আর্থিক লেনদেনের সম্পর্কিত বিরোধের কারণে তাঁরা দুবাই পুলিশকে তথ্য দেন। একটি শপিং মল থেকে বেনজীরকে আটক করা হয়। উল্লেখ্য, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি দুবাই পুলিশের বিচারে কার্যকরী ছিল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন