প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
দেশের প্রধান চিংড়ি উৎপাদন অঞ্চল খুলনায় নানা সংকটে উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মানসম্মত ও ভাইরাসমুক্ত পোনার সংকট, খরা, অতিবৃষ্টি, লবণ পানির স্বল্পতা, রোগবালাইসহ নানা কারণে দিন দিন চিংড়ি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা। উৎপাদন বাড়াতে না পারায় রফতানি আয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় মোট ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৪ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৯ দশমিক ৬২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন সামান্য কমেছে। তবে একই সময়ে চিংড়ি ঘেরের সংখ্যা ২ লাখ ৬ হাজার ২৭৮টি থেকে বেড়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ২৪০টিতে উন্নীত হলেও সে হারে উৎপাদন বাড়েনি।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সর্বশেষ অর্থবছরে খুলনায় ৩০ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন, বাগেরহাটে ৪৪ হাজার ৫২৪ দশমিক ৩৪ মেট্রিক টন এবং সাতক্ষীরায় ৪০ হাজার ২০ দশমিক ৪৬ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার চিংড়ি চাষি কৌশিক বাগচি বলেন, 'একসময় চিংড়ি চাষ করে ভালো লাভ হতো। এখন মানসম্মত ও ভাইরাসমুক্ত পোনা পাওয়া সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনেক সময় লাখ লাখ টাকার পোনা ছাড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রোগে মারা যায়। তখন ঋণের টাকা শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই সরকার মানসম্মত পোনা নিশ্চিত করুক এবং ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করুক।'
একই উপজেলার চাষি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, 'আগে মৌসুম অনুযায়ী লবণ পানি পাওয়া যেত। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কখনও দীর্ঘ খরা, আবার কখনও অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এতে ঘেরের পানির লবণাক্ততা ঠিক রাখা যায় না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যায় না। অনেকেই তাই চিংড়ি চাষ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।'
আরেক চাষি শেখ সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বা উৎপাদন বাড়াতে হবে, সে বিষয়ে অনেক চাষিরই ধারণা নেই। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, মানসম্মত খাদ্য ও পোনা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব।'
উৎপাদনে স্থবিরতা থাকলেও রফতানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চল থেকে ৩৫ হাজার ৯৭০ দশমিক ৩৯০ মেট্রিক টন চিংড়ি রফতানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৮৭৬ দশমিক ৩৬৫ মেট্রিক টন থেকে প্রায় ১ হাজার ৯৪ মেট্রিক টন বেশি। তবে রফতানির পরিমাণ বাড়লেও আয় কমেছে।
সর্বশেষ অর্থবছরে রফতানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি ৭৩ লাখ টাকার সমপরিমাণ, যেখানে আগের অর্থবছরে আয় ছিল প্রায় ৩১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ রফতানির পরিমাণ বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ায় আয় কমেছে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি তারিকুল ইসলাম জহির বলেছেন, 'বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির এখনও ভালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। বর্তমানে ইকুয়েডর, ভারত ও ভিয়েতনাম আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে বেশি উৎপাদন করছে। আমাদেরও মানসম্মত পোনা উৎপাদন, ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের চাষাবাদ এবং রফতানিকারকদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। তা না হলে রফতানি বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।'
খুলনা মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক বিপুল কুমার বসাক বলেন, 'চিংড়ি শিল্পকে টেকসই করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, ঘের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত পোনা উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা আরও বাড়ানো হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।'
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন