প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্পটি দেশের অন্যতম সফল শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগ হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্পটির মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। এদিকে, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে এই প্রকল্পটি শুরু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে, রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি চালু হওয়ার সময়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আগত ছিল তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল করে তুলেছিল।
এ প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় চারটি উৎপাদন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর, এবং নতুন রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ইসিফরজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান জানান, প্রকল্পটি প্রায় সব প্রধান কর্মপরিচালনা সূচকেই নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়েছে এবং একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু রপ্তানি বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য সক্ষম করে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও। প্রকল্পের ফলাফল প্রমাণ করে যে, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে শিল্পখাতের রূপান্তর উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হতে পারে।
আব্দুর রহমান জানান, প্রকল্পের অন্যতম কার্যকর উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই ম্যাচিং গ্রান্ট কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। এসব সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানেরা পরিবেশ, সামাজিক ও গুণগত মান (ইএসকিউ) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন, এবং নতুন বিদেশি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ইআরএফের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন (কো-ইনভেস্টমেন্ট) এসেছে, যা সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে।
প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে।
প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানিকারকের হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে, তাদের গড় রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।
এছাড়া, ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, শিল্প অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে ইসিফরজে প্রকল্প। এর আওতায়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এছাড়া, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ হাইটেক সিটিতে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং গাজীপুরের কাশিমপুরে ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইজিইটি) এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইআইজিইটি)-এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, এসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য উন্নত প্রযুক্তিসেবা, পণ্য উন্নয়ন, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং কমপ্লায়েন্স বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে উপকৃত করেছে। তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই নারী।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজারের প্রায় তিন গুণ।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন তুলে ধরে আব্দুর রহমান বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার এবং বেসরকারি খাতের সফল অংশীদারিত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে ইসিফরজে প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা দ্বারা।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রপ্তানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্ভাবনী দিক ছিল অনুদান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সংস্থা আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি, এবং নির্ধারিত অগ্রগতি যাচাইয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড়ের কাজ পরিচালনা করেছে। এর ফলে একদিকে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও উৎসাহিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতার কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমেই বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হতে পারে। ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্য তা প্রমাণ করে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন