প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের একটি তালিকা প্রস্তুত করে শিক্ষা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটি দীর্ঘ পরিত্যক্ত খামার ঘর। কিন্তু, কাছে গেলে দেখা যায় জরাজীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোলপাতার ছাউনির শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই গোলপাতা এবং পলিথিনের ছাউনিতে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম তেলিগাতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আতঙ্কের মধ্যে শিক্ষকরা পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়ে একটি পাকা ভবন ছিল। ২০২২ সালে পাকা ভবনটি নিলামে অপসারণের পর থেকে শিক্ষকরা নিজেদের অর্থ নিয়ে গোলপাতা দিয়ে একটি ঘর তৈরি করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সময়ে তিনটি ক্লাস শুরু হলে পাঠদানের সময় শিক্ষকরা বিড়ম্বনায় পড়েন। শুধু পশ্চিম তেলিগাতি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, একই উপজেলার ঢুলিগাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা থেকেও একই চিত্র দেখা যায়।
কিছু বিদ্যালয়ে ভবন নেই, কিছু জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পিলারের বড় বড় ফাটল এবং ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পরিত্যক্ত ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ঝুঁকি ও আতঙ্কের মধ্যেই এসব ভবনে পাঠদান কার্যক্রম চলছে, ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ ব্যাপারে দ্রুত বিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
পশ্চিম তেলিগাতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তার বলেন, ‘বৃষ্টি পড়লেই আমাদের বই খাতা ভিজে যায়, আমরাও ভিজে যাই। বই খাতা নিয়ে লাইব্রেরিতে চলে যেতে হয়। গরমে আমরা ক্লাস করতে পারি না, খুব কষ্ট হয়। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কত বিদ্যালয় দেখি, বড় বড় ভবন। আমাদেরও ইচ্ছে ওই রকম ভবনে পড়াশোনা করতে।’
জুয়েল নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের খুব কষ্ট হয় এই ক্লাসে পড়াশোনা করতে। ক্লাসের পাশে বেড়া নেই, বৃষ্টি হলেই ঝরঝর করে পানি পড়ে, কারেন্ট নেই, ফ্যান নেই, আমরা কীভাবে ক্লাস করব। তাই আমাদের একটা ভবন দরকার। এ ছাড়া আমাদের স্যারের ও ম্যাডামের খুবই কম। আমাদের স্যারের ম্যাডামের প্রয়োজন।’
অভিভাবক ইমাম শেখ বলেন, ‘এখানে শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করে। তাদের ক্লাস করার মতো কোনো অবস্থা নেই। এখানে পুরনো একটা ভবন ছিল, যা নিলাম করে নিয়ে গেছে। এরপর একটি ভবন দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আজকে তিন বছর হয়ে গেছে, আমরা এখনও কোন ভবন পাইনি। এখন বৃষ্টি আসলেই শিশুদের বই খাতা ভিজে নিয়ে বাড়িতে দৌড় দিই। স্কুলের চালের ওপর পলিথিন দিয়ে ক্লাস চলে। ছোটদের নিয়ে আমরা খুবই চিন্তার মধ্যে আছি।’
১৯০ নম্বর পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার জানান, ‘আমাদের বিদ্যালয়টি খুবই নাজুক। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ক্লাস করতে খুব অসুবিধা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টি হলেই ক্লাস বন্ধ করতে হয় আবার বৃষ্টির পরে শুরু করতে হয়। আমাদের এখানে যে গোলপাতার ঘরটি, সেটি নিজেদের উদ্যোগে তৈরি করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। ছয় পোস্টে তিনজন শিক্ষক নিয়ে স্কুল চলছে। আমাদের শিক্ষার্থী ৯৭ জন, অথচ শিক্ষক তিনজন। তাদের নিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা খুবই কষ্টকর। এর কারণে আমরা মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হোক। আর আপাতত সংস্কার করার জন্য একটি বরাদ্দ দেওয়া হোক।’
একই ইউনিয়নের ২৪৬ নম্বর পশ্চিম ঢুলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। সেখানে পরিত্যক্ত ভবনের পিলারে বড় বড় ফাটল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। একটু বৃষ্টি হলেই পরিত্যক্ত ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ঝুঁকি ও আতঙ্কের মধ্যে এসব ভবনে পাঠদান কার্যক্রম চলছে, ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তোহিফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের স্কুলে ভবন না থাকার কারণে সাধারণ মানুষের বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ নেই। এখানে এক সময় অনেক ছাত্র-ছাত্রী ছিল এবং এক সময় এই ইউনিয়নের মধ্যে এই স্কুল বৃত্তিতে শীর্ষস্থানীয় ছিল। এখন সে স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী আসে না। ভবন না থাকার কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এই ভবনের জন্য সব দফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর হাবিবুল্লাহ জানান, ‘উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো দুর্বল ও সংকট রয়েছে। এগুলোর দ্রুত সংস্কার ও ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা কমিটির সভায় রেজুলেশন করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। অবকাঠামোগত সংকট থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণ হলে সমস্যা সমাধান হবে।’
বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার চিতলমারী উপজেলায় ৩৭টি, মোল্লাহাটে ১১টি, রামপালে ১৩টি, মোংলায় ২টি, ফকিরহাটে ৩০টি, মোরেলগঞ্জে ৩৪টি, শরণখোলায় ১১টি, কচুয়ায় ১২টি এবং বাগেরহাট সদরে ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন নেই।
বাগেরহাটের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান জুয়েল জানান, ‘জেলায় এক হাজার ১৬২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২০০টিতে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এসব ভবনের তালিকা প্রস্তুত করে শিক্ষা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন