প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দরবার শরীফ একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে পরিচিত। প্রতি বছর এখানে চার দিনব্যাপী বাৎসরিক উরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৭ সালের উরস ও বিশ্ব ইসলামী মহাসম্মেলনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নদীপথে আসতে শুরু করেছে বিশাল বাঁশের ভেলা। ভক্তদের কাছে এই বাঁশগুলো ‘নজরানা’ বা খেদমতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার বাঁশ একত্রিত করে তৈরি করা হয় এসব ভেলা। এরপর, দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে স্রোত, নাব্যতা এবং নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ভেলাগুলো আটরশি দরবারে পৌঁছে যায়।
দরবার-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে খাজাবাবা ফরিদপুরীর নির্দেশে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় প্রথম ‘নজরানার বাঁশ’ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শুরুতে এই যাত্রায় যুক্ত ছিল মাত্র দুটি ভেলা। প্রথমদিকে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে ভেলা ছাড়া হলেও পরে চিলমারী ঘাটকে কেন্দ্র করে এই নৌযাত্রা নিয়মিত হয়ে ওঠে। সময়ের সাথে সাথে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এই প্রথা।
বর্তমানে কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাটসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও নরসিংদী, পাবনা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী থেকে ভক্তরা বাঁশ নিয়ে আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। অনেক এলাকায় উরসের কয়েক মাস আগে থেকেই বাঁশ সংগ্রহ ও ভেলা তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়।
একেকটি বড় ভেলায় ২ থেকে ৩ হাজার পর্যন্ত বাঁশ থাকে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য বাঁশগুলো বিশেষ কৌশলে বাঁধা হয়। ভেলার ওপর তৈরি করা হয় ছাউনি বা অস্থায়ী ঘর। সেখানে ভক্তদের থাকার, রান্নাবান্না করার এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটি ভেলায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ভক্ত অবস্থান করেন। ইঞ্জিনচালিত নৌযানের পরিবর্তে লগি, বৈঠা ও নদীর স্রোতকে কাজে লাগিয়েই এগিয়ে চলে এসব ভেলা।
কুড়িগ্রামসহ দূরবর্তী জেলা থেকে আটরশি দরবারে পৌঁছাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে ভক্তরা ভেলার ওপরেই অবস্থান করেন। সেখানে খাবার প্রস্তুত ও বিশ্রামের পাশাপাশি ইবাদত, জিকির, হামদ-নাত ও মোর্শেদি গানে সময় কাটান তারা।
তবে নদীযাত্রা মোটেও সহজ নয়। ভেলাগুলোকে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, করতোয়া, যমুনা, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ ও কুমারসহ বিভিন্ন নদী ও খাল পাড়ি দিতে হয়। কোথাও নাব্যতা কম থাকলে ভেলা টেনে নিতে হয়, কোথাও কচুরিপানা কেটে পথ তৈরি করতে হয়। আবার প্রবল স্রোতের বিপরীতে বৈঠা চালিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়াও দীর্ঘ এই যাত্রার অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বাঁশ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভেলা তৈরি এবং দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে তা দরবারে পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই ভক্তরা খেদমত হিসেবে করেন। তারা বাঁশের কোনো মূল্য নেন না, এমনকি নিজেদের শ্রমের জন্যও কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। অর্থাৎ বাঁশ সংগ্রহ, ভেলা তৈরি ও পরিবহনের পুরো কাজটি সম্পন্ন হয় স্বেচ্ছাশ্রমে। দীর্ঘ পথের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ভেলা আটরশি দরবারে পৌঁছালে ভক্তরা মানসিক তৃপ্তি পান বলে জানান।
আটরশি দরবারে পৌঁছানোর পর এসব বাঁশ উরসের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। সামিয়ানা ও অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, সাজসজ্জাসহ অন্যান্য আয়োজনে ব্যবহারের পাশাপাশি বাঁশের কিছু অংশ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
দরবার-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাঁশের ভেলা নিয়ে যাত্রার জন্য খাজাবাবা ফরিদপুরী একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর বাংলা আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম বুধবার জলসা এবং বৃহস্পতিবার উষালগ্ন থেকে ভক্তরা ভেলা নিয়ে দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
মাত্র দুটি ভেলা দিয়ে ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া এই নদীযাত্রা ৫১ বছর পরও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। নদীর স্রোত, নাব্যতা ও দীর্ঘ পথের বাধা পেরিয়ে প্রতিবছর ভক্তদের বহন করে আটরশি দরবারে পৌঁছে এসব বাঁশের ভেলা। পরে সেই বাঁশই ব্যবহৃত হয় উরসের নানা আয়োজনে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন