প্রধান কার্যালয়ঃ ৩-ডি, কাব্যকস ভবন, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি- ২০৪৪৭৪/২০২৫
ফোন:- 02224458547-01339-314085
ই-মেইল- crimebd2025@gmail.com
সোনা এখন আর শুধুমাত্র অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং অনেকের কাছে এটি একটি বড় বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। দেশে সোনার দাম দুই লাখ টাকার উপরে চলে যাওয়ার ফলে অলংকার কেনার সময় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে এর মান, ক্যারেট, হলমার্ক এবং বিক্রির শর্ত নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, কত ক্যারেটের সোনা কেনা হলে লাভজনক হবে এবং প্রতারণা এড়াতে গ্রাহকদের কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?
১৯৭১ সালে, যখন দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তখন এক ভরি সোনার দাম ছিল ১৭০ টাকা। ৫৫ বছরের মধ্যে সেই দাম বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি, ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়ে প্রতি ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বর্তমানে দাম কিছুটা কমে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেট সোনার অলংকার বিক্রি হয়ে থাকে। ক্যারেট সোনার বিশুদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২৪ ক্যারেটকে খাঁটি সোনা হিসেবে ধরা হয়। ২২, ২১ এবং ১৮ ক্যারেটের সোনায় নির্দিষ্ট অনুপাতে রুপা, তামা বা দস্তার মতো অন্যান্য ধাতু মেশানো থাকে।
বিশ্বজুড়ে সোনার বিশুদ্ধতা বোঝাতে অলংকারে নির্দিষ্ট নম্বর বা চিহ্ন খোদাই করা হয়, যা হলমার্ক নামে পরিচিত। ২৪ ক্যারেট সোনায় সাধারণত ‘২৪কে’ বা ‘৯৯৯’ লেখা থাকে, যা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধতা নির্দেশ করে। ২২ ক্যারেটে থাকে ‘৯১৬’, অর্থাৎ ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ; ২১ ক্যারেটে ‘৮৭৫’, অর্থাৎ ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৮ ক্যারেটে ‘৭৫০’, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধতা।
একাধিক জুয়েলার্স মালিকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২১ ক্যারেটের অলংকারের বিক্রি বেশি হয়ে থাকে। মেশিনে তৈরি চুড়ি, চেইন ও ব্রেসলেট সাধারণত ২২ ক্যারেটের হয়ে থাকে। তবে মেশিনে ২১ ও ১৮ ক্যারেটের অলংকারও তৈরি করা সম্ভব। অলংকারে বেশি নকশা এবং ঝালাইয়ের প্রয়োজন হলে তুলনামূলক কম ক্যারেটের সোনা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
কোন ক্যারেটের সোনার অলংকার কেনা লাভজনক হবে, এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, "যেকোনো ক্যারেটের সোনার অলংকার কেনা যেতে পারে। কম ক্যারেটের সোনা মানেই নিম্নমানের এমন ধারণা সঠিক নয়। বিদেশে ৯ ক্যারেটের অলংকারও তৈরি হয়।"
তবে, তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যে ক্যারেটের অলংকারই কেনা হোক না কেন, সেটি হলমার্ক করা আছে কি না, তা অবশ্যই দেখা উচিত। পাশাপাশি ক্যাশমেমোতে ক্যারেট ও অন্যান্য তথ্য উল্লেখ আছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। তিনি জুয়েলার্স সমিতির সদস্য প্রতিষ্ঠান থেকে অলংকার কেনার পরামর্শও দিয়েছেন।
বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে ‘বাংলা গোল্ড’ ও ‘ঢাকা গোল্ড হলমার্ক’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান সোনা পরীক্ষা করে হলমার্ক প্রদান করে। পরীক্ষায় সোনার যে ক্যারেট পাওয়া যায়, সে অনুযায়ী অলংকারে লেজারের মাধ্যমে তা খোদাই করা হয়। পাশাপাশি একটি সনদ প্রদান করা হয়, যা সংশ্লিষ্ট জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকে।
ঢাকার বাইরের অনেক ব্যবসায়ী সোনার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে ‘টোনস মেশিন’ ব্যবহার করেন। জুয়েলার্স মালিকদের মতে, এই মেশিনে সোনার বিশুদ্ধতার কাছাকাছি তথ্য পাওয়া যায়।
হলমার্ক করা অলংকার ও ক্যাশমেমো থাকলে পরবর্তী সময়ে সোনা বিক্রি করা তুলনামূলক সহজ হয়। পুরোনো অলংকার বিক্রির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ এবং পুরোনো অলংকার দিয়ে নতুন অলংকার তৈরির ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ বাদ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
এদিকে, সোনার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম ক্যারেটের সোনা ও অন্যান্য ধাতু দিয়ে তৈরি অলংকারের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রোঞ্জের সাথে দুই থেকে তিন আনা সোনা মিশিয়ে তৈরি করা ‘সোনার’ চুড়ি ও বালা কিছু এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব পণ্যে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু সোনা রয়েছে, তা পরিমাপের নির্দিষ্ট মাপকাঠি না থাকায় গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই কারণে, গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের জুয়েলারি দোকানগুলোতে ব্রোঞ্জের সোনার চুড়ি ও বালা বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে জুয়েলার্স সমিতি। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও এ ধরনের পণ্য না কেনার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে, ঢাকার বাইরের কিছু এলাকার গুটিকয়েক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান সমিতির নির্ধারিত দামের তুলনায় কম দামে সোনার অলংকার বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে। অনলাইনেও মাঝে মাঝে কম দামে সোনার অলংকার বিক্রির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অলংকার সরাসরি না দেখে অনেকে এসব বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে অর্ডারও করছেন।
দেওয়ান আমিনুল ইসলামের মতে, জুয়েলার্স সমিতির নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে সোনা বিক্রির বাস্তবসম্মত সুযোগ নেই। তিনি সতর্ক করেছেন যে, কেউ কম দামে বিক্রি করলে সোনার মানে কোনো ধরনের ঘাপলা থাকতে পারে। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন বিক্রেতার কাছ থেকে সোনা কেনা উচিত নয়।
সোনা যেহেতু অত্যন্ত মূল্যবান ধাতু, তাই অলংকার কেনার সময় শুধুমাত্র দাম নয়, ক্যারেট, হলমার্ক, ক্যাশমেমো, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে বিক্রির শর্ত সবকিছু যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন